নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: রাজ্যে পালাবদলের পর সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, কাটমানি এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন। বিভিন্ন এলাকা থেকে সরকারি প্রকল্পে সুবিধা ও পরিষেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের ভুরিভুরি অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই কড়া পদক্ষেপও নিচ্ছে প্রশাসন। এবার ‘কাটমানি’ নেওয়ার অভিযোগে ডোমকলে গ্রেফতার হলেন তৃণমূল নেতা বাসির মোল্লা। প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পর আতঙ্কে রয়েছে অন্যান্য তৃণমূলের নেতারাও।
বিগত কয়েক বছর আগে ডোমকল ব্লকের সারাংপুর এলাকার তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি ছিলেন তিনি। অভিযোগ, সেই সময় আবাস যোজনা প্রকল্পে ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও ওই ব্যক্তি ঘর পাননি বলে অভিযোগ। সূত্রে জানা গিয়েছে, সারাংপুর এলাকার এক ব্যক্তি ডোমকল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, আবাস যোজনার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঘর মেলেনি। বারবার যোগাযোগ করেও কোনও সদুত্তর পাননি। টাকা ফেরৎ চাইলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হত। এরপরই প্রশাসনের দারস্থ হন ওই ব্যক্তি।
এদিন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী। অভিযোগ পাওয়ার পরই মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। এরপর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডোমকলের নাজিরপুর এলাকা থেকে বাসির মোল্লাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তৃণমূল নেতা বাসির মোল্লার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ৩১৮(৪) (প্রতারণা) এবং ৩০৮ (বিশ্বাসভঙ্গ ও জালিয়াতি)-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারীরা জানতে চেষ্টা করছেন, এই ধরনের অভিযোগে অন্য কোনও ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কোনও বৃহত্তর চক্র সক্রিয় ছিল কি না। শুক্রবার তাঁকে আদালতে তোলা হয়।
অভিযোগ, সারাংপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কোনো সরকারি পদে না থেকেও, বাসির মোল্লা অলিখিতভাবে গোটা পঞ্চায়েত নিজের ইশারায় চালাতেন। পঞ্চায়েত প্রধান থেকে শুরু করে সরকারি আধিকারিক ও কর্মচারীদের তিনি নিজের মতো করে পরিচালনা করতেন। ধৃত বাসির মোল্লা ডোমকল ব্লকের সারাংপুরের অঞ্চল সভাপতি ছিলেন। পরে তাঁকে কোর-কমিটি সদস্যও করে ঘাঁসফুল শিবির। তাঁর এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি পঞ্চায়েতের কোনো প্রতিনিধিও মুখ খোলার সাহস পেতেন না। শুধু তাই নয়, তাঁর কোনো অপছন্দের বা দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলে তিনি সাংবাদিকদেরও সরাসরি হুমকি দিতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, কার্যত তিনিই পঞ্চায়েত পরিচালনা করতেন এবং পঞ্চায়েতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর মতামতই শেষ কথা হিসেবে বিবেচিত হত। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে ওই এলাকায় বাসির মোল্লার প্রভাব এতটাই ছিল যে, অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পেতেন না। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি প্রকল্প, উন্নয়নমূলক কাজ কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে এলাকায় তাঁর দাপট ছিল হিন্দি সিনেমার ‘দাবাং’ চরিত্রের মতো। বাসির মোল্লার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইতেন না।
অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে এসেছে, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হত। বিশেষ করে আবাস যোজনা, বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কাটমানির অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। যদিও তৎকালীন শাসকদল সেই অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্বীকার করেছিল। ডোমকলের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই গ্রেফতারের ফলে অতীতে ঘটে যাওয়া অনিয়মের আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এগোচ্ছে এবং সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই গ্রেফতারি শুধু একটি কাটমানি মামলার তদন্ত নয়, বরং রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। নতুন প্রশাসনের আমলে সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি এবং কাটমানির অভিযোগের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে বারবার দাবি করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ডোমকলের এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রসঙ্গত, রাজ্যে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির খতিয়ান খতিয়ে দেখছে বর্তমান প্রশাসন। শুভেন্দুর পুলিশের এই কড়া অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে, দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎকারী কাউকেই রেয়াত করা হবে না।
