বৃষ্টির জেরে জলযন্ত্রণা: ডোমকল শহরে নিকাশি ব্যবস্থার অভাবে দুর্ভোগ, পুর পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ বাসিন্দাদের

(রঘুনাথপুর থেকে ধূলাউড়ি পর্যন্ত রাস্তায় বেহাল দশা। || Image: Daily Domkal)

নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: বৃষ্টিতে কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে ডোমকল পুরসভার একাধিক এলাকা। পর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থার অভাবে বৃষ্টির জল বের হতে না পেরে দিনের পর দিন জমে থাকছে রাস্তাঘাট ও বসতিপূর্ণ এলাকায়। ফলে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন বহু বাসিন্দা। হাঁটু জল পেরিয়ে স্কুল, বাজার, অফিস কিংবা দৈনন্দিন কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় পুর পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে নাগরিকদের। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ডোমকল পুরসভার আজিমগঞ্জ, জয়রামপুর, ভাতশালা, রঘুনাথপুর, বর্তনাবাদ, জিতপুর-সহ একাধিক ওয়ার্ডে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যাচ্ছে। কোথাও রাস্তার উপর, কোথাও আবার বাড়ির সামনেই জল থইথই করছে। জল নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির জল দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে কয়েকদিন ধরে একই পরিস্থিতি বজায় থাকছে।

শুধু জল জমাই নয়, পুর এলাকার বহু রাস্তাও বর্তমানে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির জল জমে সেই গর্তগুলি ঢেকে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও সাইকেল আরোহীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনের বেলায় কোনওরকমে চলাচল করা গেলেও রাতে এই রাস্তায় যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে রঘুনাথপুর থেকে ধূলাউড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার অবস্থা নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক দশক ধরে এই রাস্তার সংস্কারের দাবি জানানো হলেও আজও স্থায়ী কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্ষার সময় রাস্তাটির অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে যে অনেক জায়গায় যানবাহন চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। জরুরি পরিষেবা, রোগী পরিবহণ এবং কৃষিজ পণ্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও চরম সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে মানুষকে। পথচারী রবিউল সেখের অভিযোগ, বর্ষা এলেই একই ছবি দেখা যায়। জল জমে রাস্তাঘাট কার্যত অচল হয়ে পড়ে। শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অনেক সময় স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জল পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন, কারণ জল জমে থাকায় ক্রেতাদের আনাগোনা কমে যাচ্ছে।

সূত্রের খবর, শহরের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বহুবার দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি। প্রতি বছর বর্ষার সময় একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। অস্থায়ীভাবে কোথাও কোথাও নালা পরিষ্কার করা হলেও স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু নিকাশি ব্যবস্থাই নয়, পানীয় জল, রাস্তা সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন না থাকায় বা অপরিকল্পিত নিকাশি ব্যবস্থার কারণে জল দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, “উন্নত নাগরিক পরিষেবার লক্ষ্যে ২১টি ওয়ার্ড নিয়ে ডোমকল পুরসভা গঠিত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুরসভা সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক পরিষেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনও পর্যন্ত শহরে কোনও কার্যকর জলনিকাশি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিশ্রুত পানীয় জলও পৌঁছায়নি। এমন পুরসভা থাকার থেকে না থাকাই ভালো।”

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে পুরসভার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাঘাত হচ্ছে। পুরসভার দাবি, বৃহৎ পরিকাঠামোগত প্রকল্প যেমন আধুনিক নিকাশি ব্যবস্থা নির্মাণ বা বিস্তৃত রাস্তা সংস্কারের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে ধাপে ধাপে সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

নাগরিকদের একাংশ অবশ্য প্রশ্ন তুলছেন, শুধুমাত্র অর্থ বরাদ্দের অভাবের কথা বললে চলবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় স্তরে কার্যকর উদ্যোগেরও প্রয়োজন রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রতি বছর বর্ষায় একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া প্রমাণ করে সমস্যাটি আর সাময়িক নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিকাঠামোগত সংকট। ডোমকলের এক কংগ্রেস নেতার কথায়, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত নিকাশি পরিকাঠামোর অভাবের কারণে ছোট শহরগুলিতে জল জমার সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। সময়মতো ড্রেন সংস্কার, নতুন নিকাশি ব্যবস্থা নির্মাণ এবং বৃষ্টির জল দ্রুত অপসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বর্ষা এখনও শেষ হয়নি। ফলে আগামী দিনেও যদি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তাহলে ডোমকল পুরসভার বিভিন্ন এলাকায় জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। তাঁদের একটাই দাবি—অভিযোগ আর আশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, যাতে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!