লাউডস্পিকার: আইনের কঠোরতা নাকি অপব্যাখ্যা!

সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের নামে ধর্মীয় স্থানে—বিশেষ করে বিভিন্ন মসজিদের মাইক বা লাউডস্পিকার খুলে ফেলার প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা রাজ্য রাজনীতি ও নাগরিক অধিকারের অঙ্গনে এক নতুন উত্তাপের জন্ম দিয়েছে। মালদার চাঁচলসহ একাধিক স্থানের ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্রের খবর সামনে আসার পর বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক পদক্ষেপের স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক নৈতিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্ট এবং ১৯৯৬ সালের কলকাতা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, কোনো ধর্মীয় স্থানে মাইক ব্যবহার করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের অংশ হতে পারে না। জনস্বাস্থ্য ও শব্দদূষণ রোধের স্বার্থে নির্দিষ্ট ডেসিবেল সীমা বেঁধে দেওয়া এবং পরিবেশ আইন অমান্য করলে নিষেধাজ্ঞা জারি করার এক্তিয়ার নিশ্চিতভাবেই প্রশাসনের হাতে রয়েছে। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ ও রূপায়ণের ধরন নিয়ে প্রশাসনিক যে ভূমিকা দেখা যাচ্ছে, তা ঘিরে তৈরি হওয়া সংশয় উপেক্ষা করার মতো নয়।

অভিযোগ উঠছে, কোনো নির্দিষ্ট লিখিত সরকারি নির্দেশিকা বা স্পষ্ট ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) ছাড়া কেবল মৌখিক নির্দেশের ওপর নির্ভর করে অনেক স্থানে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সংবিধানের ১৪ (সাম্যের অধিকার), ১৯ (মতপ্রকাশের স্বাধীনতা), ২১ (জীবনের অধিকার) এবং ২৫-২৮ (ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার) নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অযথা ভীতি, উৎকণ্ঠা ও বিভ্রান্তি। আদালতের আসল বার্তা ছিল শব্দের মাত্রা বা ডেসিবেল নিয়ন্ত্রণ করা, ঢালাওভাবে সাউন্ড সিস্টেম বা মাইক বন্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা নয়।

একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি: প্রথমত, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপে পূর্ণ স্বচ্ছতা। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নিঃসন্দেহে জনস্বার্থের অনুকূলে এক অপরিহার্য পদক্ষেপ। কিন্তু সেই আইন বলবৎ করার প্রক্রিয়ায় যদি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা স্বচ্ছ বিজ্ঞপ্তির অভাব থাকে, তবে তা আইনের সুশাসনের বদলে প্রশাসনিক স্বৈরাচারের রূপ নিতে পারে।

প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে শব্দদূষণ আইনের সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট ও লিখিত এসওপি প্রকাশ করা এবং ডেসিবেল মাপা ও নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নোটিশ দেওয়ার নিয়ম চালু রাখা। পক্ষান্তরে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দলগুলির দায়িত্ব কেবল উস্কানিমূলক বার্তা না দিয়ে পরিবেশ আইন ও আদালতের নির্দেশিকাকে সম্মান জানিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিকদের মৌলিক ধর্মীয় আবেগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাটা প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, যাতে কোনো অবস্থাতেই সামাজিক সম্প্রীতি ও বিশ্বাস ক্ষুণ্ন না হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!