ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ‘নিউজক্লিক’ এবং পোর্টালটির প্রধান সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থের বিরুদ্ধে ওঠা বেআইনি বিদেশি অর্থায়নের সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দিল দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির এই পদক্ষেপ ছিল সম্পূর্ণ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং মুক্ত ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার ওপর একটি ‘স্বেচ্ছাচারী আক্রমণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার’। দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি নীনা বনশল কৃষ্ণা এই মামলার রায় দানকালে অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান, এই আইনি প্রক্রিয়া বা তদন্ত চালিয়ে যাওয়া মানে “আইনের শাসন এবং বিচার প্রক্রিয়ার চরম অপব্যবহার” ছাড়া আর কিছুই নয়। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে দিল্লি পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ শাখার দায়ের করা এফআইআর এবং তার ভিত্তিতে ইডির শুরু করা অর্থ পাচার মামলা—দুই-ই পুরোপুরি খারিজ হয়ে গেল। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পক্ষে এক ঐতিহাসিক জয় হলো।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের আগস্ট মাসে দিল্লি পুলিশের ইকোনমিক অফেন্সেস উইং দাবি করেছিল, নিউজক্লিকের মূল সংস্থা ‘পিপিকে নিউজক্লিক স্টুডিও প্রাইভেট লিমিটেড’ ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে আমেরিকার একটি সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড মিডিয়া হোল্ডিংস এলএলসি’ থেকে ৯.৫৯ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্মের এফডিআই নীতি বা নিয়ম এড়াতে শেয়ারের অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ইডির দাবি ছিল, এই টাকার একটা বড় অংশ বেতন, কনসালটেন্সি ফি ও বাড়ি ভাড়ার নামে অনত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এদিন মামলার সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখার পর বিচারপতি নীনা বনশল কৃষ্ণা তদন্তকারী সংস্থাগুলির প্রতিটি দাবিকে আইনি যুক্তিতে খণ্ডন করেন। আদালত মনে করিয়ে দেয়, যখন এই বিনিয়োগ এসেছিল, তখন ভারতে ডিজিটাল বা অনলাইন নিউজ মিডিয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কোনো ঊর্ধ্বসীমা বা ক্যাপ ছিল না। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক নিজেই স্পষ্ট করেছিল, অনলাইন পোর্টালগুলি প্রিন্ট মিডিয়ার নিয়মের আওতায় পড়ে না। জালিয়াতি বা প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে আদালত একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে, “প্রতারণার অপরাধ প্রমাণ করতে গেলে তো একজন ‘প্রতারিত’ ব্যক্তি বা সংস্থাকে থাকতে হবে। যেহেতু বিনিয়োগকারী মার্কিন সংস্থা নিজেই কোনো অভিযোগ করেনি, তাই জালিয়াতির তত্ত্ব খাটেই না।” আদালত স্পষ্ট করেছে, শেয়ারের মূল্যায়ন ফেমা আইন মেনেই করা হয়েছিল এবং এটি একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। এছাড়া বেতন বা ভাড়া দেওয়া একটি সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক খরচ, কোনো টাকা তছরুপ বা সাইফনিং নয়। দিল্লি হাইকোর্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে নোট করেছে, বিগত প্রায় দেড় বছর ধরে ব্যাপক তল্লাশি ও তদন্ত চালানো সত্ত্বেও ইডি নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে একটিও আপত্তিকর বা সন্দেহজনক তথ্য-প্রমাণ আদালতে পেশ করতে পারেনি। এর আগে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউজক্লিকের অফিস ও সম্পাদকদের বাড়িতে ম্যারাথন তল্লাশি চালিয়েছিল ইডি।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লি পুলিশ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ইউএপিএ মামলায় প্রবীর পুরকায়স্থকে গ্রেফতার করেছিল। অভিযোগ ছিল চিনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করার চেষ্টা চলছে। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট প্রবীর পুরকায়স্থের সেই গ্রেফতারিকে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে তাঁকে জেল থেকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছিল। আর এবার বিদেশি অর্থায়নের মূল মামলাটিই হাইকোর্টে খারিজ হয়ে যাওয়ায় নিউজক্লিক কর্তৃপক্ষ আইনি লড়াইয়ে বড়সড় জয় পেল বলে মনে করা হচ্ছে।
