নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: নির্বাচন কমিশনের হেয়ারিং নোটিশকে ‘অন্ধকারের পরোয়ানা’ আখ্যা দিয়ে শুনানিতে গেলেন না বিশিষ্ট সমাজকর্মী জিম নওয়াজ। ২৮ জানুয়ারি তাঁর নির্ধারিত শুনানি থাকলেও, কমিশনের প্রক্রিয়াকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অস্বচ্ছ’ দাবি করে শুনানিতে হাজির হননি তিনি। একইসঙ্গে এই পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন নওয়াজ।
জানা গিয়েছে, তাঁর বাবার ছয়ের বেশি সন্তান থাকায় তাঁকে নোটিশ ধরায় কমিশন। গত ২৮ জানুয়ারি তাঁর শুনানির দিন ধার্য থাকলেও, তিনি সচেতনভাবেই তাতে অংশ নেননি। তাঁর দাবি, যে প্রক্রিয়ায় কমিশন নাগরিকত্বের পরিচয় বা তথ্য যাচাই করছে, তা ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায়ের পরিপন্থী। সমাজকর্মী এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, কমিশনের নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে যে— তিনি যাঁকে পিতা (আব্বা) বলে উল্লেখ করেছেন, আরও ছয়জন ব্যক্তিও নাকি একই দাবি করেছেন। কিন্তু সেই ছয়জন ব্যক্তির নাম বা ভোটার কার্ড নম্বর সম্পর্কে কোনো তথ্যই নোটিশে দেওয়া হয়নি। তিনি ১৯৭৮ সালের মহিন্দর সিং গিল বনাম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে কোনো প্রশাসনিক নোটিশ অবশ্যই ‘সুনির্দিষ্ট এবং তথ্যপূর্ণ’ (Specific and Speaking) হতে হবে। তথ্যের ভিত্তি গোপন রেখে শুনানি করা আসলে ‘অন্ধকারে রেখে বিচার’ করার শামিল।
শুনানিতে উপস্থিত না হওয়ার পেছনে তিনি আরও কিছু জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। সমাজকর্মীর বক্তব্য, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার আধিকারিক শুনানি করছেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (SOP) নেই। ফলে ভিন্ন ভিন্ন আধিকারিক তাঁদের মর্জিমাফিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতার অধিকার লঙ্ঘন করে। খসড়া তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নামক এক গোপন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তাঁকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
সমাজকর্মীর বলেন, ১৯৫১ সালের হারলা বনাম রাজস্থান রাজ্য মামলার রায় অনুযায়ী, কোনো নিয়ম জনগণের ওপর প্রয়োগ করার আগে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। সাধারণ আইনি নীতি অনুযায়ী, প্রমাণের দায়ভার অভিযোগকারীর ওপর থাকে। সমাজকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন, “কমিশন যখন আমাকে অভিযুক্ত করছে, তখন প্রমাণের দায়ভার কমিশনেরই হওয়া উচিত। অথচ এখানে নাগরিককেই নিজের পরিচয় নতুন করে প্রমাণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।”
বাবার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে তিনি কেবল ভোটাধিকারের লড়াই নয়, বরং সামাজিক মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, আর্টিকেল ২১ অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত। ২০১৭ সালের পুত্তস্বামী মামলার রায় অনুযায়ী, ব্যক্তিগত পরিচয় ও মর্যাদা সংবিধানের মূল সুরক্ষার অংশ। শুনানিকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, তিনি কোনো নতুন নথি বা উত্তর কমিশনকে দেবেন না। প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে নাগরিকদের পরিচয় নিয়ে এই ‘ছিনিমিনি’ খেলার প্রতিবাদে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের (Supreme Court) দ্বারস্থ হচ্ছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “আমার অস্তিত্ব কোনো যান্ত্রিক লজিকের ওপর নির্ভর করে না, আমার অস্তিত্ব সংবিধানের রক্ষাকবচে সুরক্ষিত।”
