ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শান্তির বার্তা দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে রবিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, মানবতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে বিশ্বশান্তি অপরিহার্য। ভাষণে জাতীয় নিরাপত্তা, নারী ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করেন তিনি।
শান্তির বার্তাবাহক ভারত
রাষ্ট্রপতি মুর্মু ভারতের প্রাচীন সভ্যতা ও বিশ্বজনীন সম্প্রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে ভারত শান্তির এক ‘দূত’ হিসেবে কাজ করছে। তাঁর কথায়, “আমাদের ঐতিহ্যে আমরা সমগ্র মহাবিশ্বের শান্তির জন্য প্রার্থনা করি। বিশ্বশান্তি বজায় থাকলেই কেবল মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে।”
জাতীয় নিরাপত্তা ও ‘অপারেশন সিন্দুর’
জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের আপসহীন অবস্থানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর অভাবনীয় সাফল্যের প্রশংসা করেন। মুর্মু বলেন, এই বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে সীমান্তের ওপারে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “গত বছর আমাদের দেশ সন্ত্রাসবাদীদের আস্তানায় নিখুঁত আঘাত হেনেছে। অনেক সন্ত্রাসবাদী খতম হয়েছে।” প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের ক্রমবর্ধমান ‘আত্মনির্ভরতা’ই এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে তিনি উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। সিয়াচেন সফর এবং সুখোই ও রাফাল যুদ্ধবিমানে তাঁর ওড়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতির ওপর দেশবাসীর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
উন্নয়নের কেন্দ্রে ‘নারীশক্তি’
২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে ‘নারীশক্তি’কে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি তথ্য দিয়ে জানান, প্রায় ১০ কোটি নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে তৃণমূল স্তরের অর্থনীতি বদলে দিচ্ছেন। পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রতিনিধিই নারী। ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ক্রীড়াক্ষেত্রে আইসিসি মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ এবং অন্ধ মহিলাদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সাফল্যের কথা উল্লেখ করে গত বছরকে ভারতীয় নারীদের জন্য একটি ‘স্বর্ণালী অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেন রাষ্ট্রপতি।
দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
রাষ্ট্রপতি জানান, গত কয়েক বছরে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের কবল থেকে মুক্ত করা হয়েছে। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো তারা যেন পুনরায় ‘দারিদ্র্যের ফাঁদে’ না পড়ে। মহাত্মা গান্ধীর ‘সর্বোদয়’ আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রায় ৮১ কোটি মানুষকে কেন্দ্রীয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে যাতে কেউ অভুক্ত না থাকে।
শাসন সংস্কার ও ডিজিটাল নেতৃত্ব
একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন যে, ভারতের সংবিধান এখন অষ্টম তফশিলভুক্ত ২২টি ভাষাতেই পাওয়া যাচ্ছে, যা ‘সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ’ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, বিশ্বের মোট ডিজিটাল লেনদেনের অর্ধেকেরও বেশি এখন ভারতেই সম্পন্ন হয়। ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং খুব শীঘ্রই এটি তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে চলেছে। জিএসটি (GST) স্বাধীনতা পরবর্তী অর্থনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।
সাংস্কৃতিক ঐক্য ও বন্দে মাতরম
‘বন্দে মাতরম’ রচনার ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—সমগ্র ভারতকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। পূর্বপুরুষদের বোনা সেই সাংস্কৃতিক ঐক্যের বুনন আজও ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে।
