TOP NEWS

“বিচারবিভাগীয় বিলম্ব বিচারকে কেবল অস্বীকার নয়, ধ্বংস করে”: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত

(Chief Justice of India (CJI) Surya Kant. || File Photo)

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বিচারিক হস্তক্ষেপে বিলম্ব কেবল বিচারকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্য কান্ত। তিনি সাফ বলেন, আদালত যখন সময়মতো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ নাগরিকরা তাদের একমাত্র প্রকৃত সুরক্ষা কবচটি হারিয়ে ফেলে। শনিবার ‘বোম্বে বার অ্যাসোসিয়েশন’ আয়োজিত ‘ফালি নরিম্যান মেমোরিয়াল লেকচার’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধান বিচারপতি এই মন্তব্য করেন।

প্রধান বিচারপতি বক্তব্যে বলেন, ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোয় হাইকোর্টগুলোর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রথম এবং প্রধান রক্ষাকবচ হলো হাইকোর্ট। তিনি বলেন, “একজন ক্ষুদ্র কৃষক যার জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, কিংবা একজন ছাত্র যাকে অন্যায়ভাবে ভর্তি হতে দেওয়া হচ্ছে না—তাদের জন্য বিলম্বিত বিচার মানে বিচার ধ্বংস হয়ে যাওয়া।” বিচারপতি কান্তের কথায়, কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রথম শুনানিতেই স্থগিতাদেশ দেওয়ার ক্ষমতা হাইকোর্টের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় শক্তি। এটিই সাধারণ নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার একমাত্র বাস্তব পথ।

ভারতের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ব্রিটিশ শাসনামলে আইন ছিল নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার, যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা ছিল অনুপস্থিত। সংবিধান প্রণেতারা সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনুচ্ছেদ ২২৬-এর মাধ্যমে হাইকোর্টকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছেন। তাঁর মতে, হাইকোর্ট কেবল আপিল আদালত বা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার মাধ্যম নয়; বরং এগুলো একেকটি প্রাণবন্ত সাংবিধানিক আদালত। তিনি বলেন, “যতক্ষণ হাইকোর্টগুলো সজাগ এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, ততক্ষণ ভারতের স্বাধীনতা কোনো অনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রশক্তির দয়ার ওপর নির্ভরশীল হবে না।”

প্রধান বিচারপতি অনুচ্ছেদ ৩২ এবং ২২৬-এর মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য টেনে আনেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সুপ্রিম কোর্ট কেবল মৌলিক অধিকার রক্ষা করে, কিন্তু হাইকোর্টের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত। হাইকোর্ট যে কোনো আইনি আঘাত সংশোধন, প্রশাসনিক বাড়াবাড়ি রোধ এবং বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে পারে। তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট হয়তো চূড়ান্ত কথা বলে, কিন্তু হাইকোর্ট বলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি। শাসনব্যবস্থা যেন কেবল দিল্লি-কেন্দ্রিক ধারণা না হয়ে স্থানীয় বাস্তবতা হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করে হাইকোর্ট।”

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রকে কেবল আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি বলেন, ভার্চুয়াল শুনানিকে আর কেবল জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে বিচারব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। বক্তৃতার শেষে প্রখ্যাত আইনজ্ঞ প্রয়াত ফালি নরিম্যানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিচারপতি কান্ত বলেন, নরিম্যান ছিলেন সাংবিধানিক নৈতিকতার আজীবন রক্ষক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংবিধান একটি জীবন্ত নদীর মতো, যার গতিপথ সঠিক রাখতে প্রতিনিয়ত নজরদারি প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টগুলোকে তাদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান এবং একটি সুশৃঙ্খল বার (আইনজীবী সমাজ) ও মনোযোগী বেঞ্চের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

(সূত্র: বার অ্যান্ড বেঞ্চ। || অনুবাদ: ওয়াসিম হায়দার।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!