ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রায় এক বছরের রাষ্ট্রপতি শাসনের অবসান ঘটিয়ে মণিপুরে নতুন সরকার গঠিত হলো। আজ সন্ধ্যায় মণিপুরের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন যুম্নাম খেমচাঁদ সিং। তাঁর সঙ্গেই শপথ নিয়েছেন দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী—নেমচা কিপগেন ও লোসি ডিকো। রাজ্যের নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন গোবিন্দাস কোনথৌজাম। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এন বীরেন সিং পদত্যাগ করার পর থেকে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি ছিল। তবে বিধানসভা ভেঙে না দিয়ে তাকে ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছিল। আজ সকালেই সেই শাসন তুলে নেওয়া হয়, যার ফলে নতুন সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হয়।
৬১ বছর বয়সী খেমচাঁদ সিং মেইতেই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে তাঁকে এক ‘অমেরুকরণ’ ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খেমচাঁদ তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শান্ত মেজাজের জন্য পরিচিত, যা বর্তমান অস্থির সময়ে মণিপুরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শপথ গ্রহণের পর সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-কে খেমচাঁদ বলেন, “বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মণিপুরের উন্নয়নের জন্য আমার ওপর এক বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আমরা রাজ্যের প্রতিটি সম্প্রদায়ের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেব এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।” উল্লেখ্য, মন্ত্রিসভায় জাতিগত ভারসাম্যের দিকেও নজর রাখা হয়েছে। খেমচাঁদ মেইতেই সম্প্রদায়ের হলেও দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে নেমচা কিপগেন কুকি এবং লোসি ডিকো নাগা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। নেমচা কিপগেন দিল্লির মণিপুর ভবন থেকে ভার্চুয়ালি শপথ পাঠ করেন।
তিন বছর আগে মণিপুরের মেইতেই (উপত্যকা অঞ্চলের প্রধান গোষ্ঠী) এবং কুকি (পাহাড়ি অঞ্চলের প্রধান গোষ্ঠী) সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তার ক্ষত আজও মেটেনি। বর্তমানে রাজ্যে এক ধরনের ‘অস্থির শান্তি’ বজায় থাকলেও রাজনৈতিক সমাধান এখনও অনেক দূরে।
বর্তমানে মূল বিরোধের জায়গাগুলো হলো— কুকি উপজাতিদের একটি অংশ রাজ্যের মূল কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের জন্য পৃথক প্রশাসনের দাবি জানাচ্ছে। প্রায় দুই ডজন বিদ্রোহী গোষ্ঠী এই দাবি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। বেশ কিছু কুকি নাগরিক সংগঠন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এই সরকারের অংশ হবে না। এমনকি সরকারে অংশ নেওয়া কুকি বিধায়কদের থেকেও তারা দূরত্ব বজায় রাখছে। মেইতেই সংগঠনগুলোর দাবি, আলোচনা চলার পাশাপাশি ত্রাণ শিবিরে থাকা কয়েক হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষকে অবিলম্বে তাদের ভিটেমাটিতে ফেরাতে হবে। অন্যদিকে, কুকি নেতাদের দাবি—রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের আলোচনা সম্ভব নয়। কুকি নেতা পাওলিয়েনলাল হাওকিপ এক্স-এ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, তাঁদের জনগণের ওপর হওয়া অত্যাচারের বিচার এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া কুকি প্রতিনিধিরা বিধানসভায় নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না।
মেইতেই নেতাদের অভিযোগ, পৃথক প্রশাসনের এই দাবি আসলে একটি জাতিভিত্তিক ভূখণ্ড তৈরির পরিকল্পনা। তাঁদের মতে, ত্রাণ শিবিরে থাকা মানুষদের অসহায় অবস্থাকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার করা উচিত নয়। মণিপুরের এই জটিল পরিস্থিতিতে খেমচাঁদ সিংয়ের নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং শান্তি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা। বক্তৃতার চেয়ে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে মণিপুরে সুদিন ফেরানোই এখন নতুন মুখ্যমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য।
