ওনিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: মুর্শিদাবাদের ডোমকলের রেনবো ক্লিনিক। বাইরে রোগীদের ভিড়, ভেতরে শীতাতপ ঘরে চলছে চিকিৎসা। কিন্তু সেই ক্লিনিকেরই বারান্দায় ৫ ঘণ্টা ধরে এক মায়ের কোলে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেল ৪ মাসের এক শিশু। বুধবার বিকেলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়াল ডোমকল হাসপাতাল মোড় সংলগ্ন এলাকায়। জলঙ্গির কালীগঞ্জ নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফরিদা খাতুনের ৪ মাসের শিশুসন্তানের অকাল মৃত্যুতে একাধিক প্রশ্ন উঠছে।
ঘটনা: একটি দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষা
জলঙ্গির নওদাপাড়া থেকে বুধবার সকাল ১১টা নাগাদ ডোমকলে এসেছিলেন ফরিদা খাতুন ও তাঁর পরিবার। তার শিশুর ঠান্ডা লেগেছিল, ছিল প্রবল কাশি এবং শ্বাসকষ্ট। পরিবারের দাবি, তাঁরা সকাল ১১টার আগেই ডোমকল হাসপাতাল মোড়ে অবস্থিত ডোমকলের পরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ ডক্টর হুমায়ুন কবিরের বেসরকারি ক্লিনিক ‘রেনবো’-তে পৌঁছান। নাম নথিভুক্ত করার পর থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা। শিশুর দিদিমা চানমন বিবি কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, “আমার নাতির অবস্থা খুব খারাপ ছিল। ও ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিল না। আমরা সকাল ১১টা থেকে ক্লিনিকের কর্মীদের বারবার অনুরোধ করেছি। বলেছি, আমাদের বাচ্চাটার অবস্থা ভালো নয়, দয়া করে ডাক্তারবাবুকে একবার দেখিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিন। কিন্তু তারা কোনো কথাই কানে তোলেনি।”
পরিবারের অভিযোগ, ক্লিনিক কর্মীরা অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করেন। তাঁদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, “সিরিয়াল অনুযায়ী ডাক্তার দেখা হবে। আপনাদের সময় হলে ঠিক ডেকে নেওয়া হবে।” এই ‘সিরিয়াল’ রক্ষা করতে গিয়ে যে একটি প্রাণ সংশয় হতে পারে, সেই ন্যূনতম বোধটুকুও ক্লিনিক কর্মীদের ছিল না বলে অভিযোগ।

শেষ রক্ষা হলো না: চিকিৎসায় দেরির মাশুল
সকাল ১১টা থেকে শুরু করে বিকেল ৪টে— দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা পর অবশেষে ডাক পড়ে ওই শিশুর। ততক্ষণে শিশুটির শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি দ্রুত বুকের এক্স-রে এবং রক্ত পরীক্ষার নির্দেশ দেন। পরিবারের লোকজন ছোটাছুটি করে সেই সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে আসার পর চিকিৎসক শিশুটিকে নেবুলাইজেশন বা ‘গ্যাস’ দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। নেবুলাইজার মেশিনে অক্সিজেন বা গ্যাস দেওয়ার মুহূর্তেই শিশুটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। শিশুর মা ফরিদা খাতুনের আর্তনাদ করে বলেন, “ওরা আমার ছেলেকে হাতে ধরে মেরে ফেলল। সময়মতো ডাক্তার দেখলে আমার সন্তান বেঁচে যেত। ওরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করছে।”
চিকিৎসকের বয়ান ও জন্মগত জটিলতার যুক্তি
ঘটনার পর উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ডোমকল থানার পুলিশ। অভিযুক্ত শিশু বিশেষজ্ঞ ডক্টর হুমায়ুন কবির ঘটনার দায় কার্যত এড়িয়ে গিয়ে শিশুর পূর্ববর্তী শারীরিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, “এই বাচ্চাটির জন্মগত অনেক জটিলতা ছিল। ওর ডাউন সিনড্রোম (Down Syndrome), হার্টের সমস্যা (Congenital Heart Disease), জন্ডিস এবং মূত্রথলিতে সংক্রমণ ছিল। আমি শেষ ওকে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দেখেছিলাম। মাঝখানে আড়াই মাস তারা আর আসেনি।” দেরি করে দেখার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার ক্লিনিকের কর্মীরা মেডিকেল ফিল্ডের লোক নয়, তাই শিশুটির অবস্থা যে এত গুরুতর তা হয়তো তারা বুঝতে পারেনি। আমার কাছে আসার পর আমি দ্রুত রিপোর্ট দেখে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করি। কিন্তু অবস্থা এতটাই আশঙ্কাজনক ছিল যে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।” চিকিৎসকের কথায়, বাচ্চার হালকা জ্বর বা বমি হলেও মায়েরা সেটিকে ইমারজেন্সি বলে দাবি করেন। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের ক্লিনিকের বাইরে ওষুধ, অক্সিজেন ও স্যালাইনের প্রাথমিক ব্যবস্থা রাখা আছে। এর বাইরে কোনো বড় সমস্যা হলে আমি নিজে গুরুত্ব দিয়ে দেখি। শিশুর অবস্থা যখন এতটাই সঙ্কটজনক ছিল, তখন তাকে সরকারি হাসপাতালে কেন স্থানান্তর করা হলো না? এই প্রশ্নের উত্তরে চিকিৎসক জানান, “আমি শিশুটিকে সরকারি হাসপাতালে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।” কিন্তু সেই প্রস্তুতির আগেই যে শিশুটির প্রাণ চলে গেল, তার দায় কার— এই প্রশ্নই উঠছে।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
এই ঘটনায় ডোমকলের সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। রানীনগরের গোধনপাড়া থেকে আসা শিশুর নানিমা বলেন, “আমরাও সকাল ১১টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে আমাদেরও বিকেল হয়ে গিয়েছে। সিরিয়াল থাকবে ঠিকই, কিন্তু গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য কি কোনো আলাদা ব্যবস্থা থাকবে না? একজন মুমূর্ষু শিশুকে আগে কেনো দেখবে না ডাক্তার!”
শিশুকে কেন ৫ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হলো?
শিশুর মৃত্যুর খবর চাউর হতেই স্থানীয় মানুষ ক্লিনিকের সামনে জড়ো হয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। উত্তেজনার খবর পেয়ে ডোমকল থানার পুলিশ পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। যদিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। এদিকে রেনবো ক্লিনিকের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচুর টাকার বিনিময়ে চিকিৎসা হলেও সেখানে আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো দক্ষ কর্মী কেন নেই, সেই প্রশ্নও উঠেছে। চিকিৎসক নিজে স্বীকার করেছেন তাঁর কর্মীরা ‘মেডিকেল ফিল্ডের’ নয়। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি কেবল নাম লেখানো আর টাকা আদায়ের জন্যই ওই কর্মীদের রাখা হয়েছে? রোগীর অবস্থা বিচার করার মতো ন্যূনতম জ্ঞান কি তাঁদের থাকা উচিত নয়?
মানবিকতার অভাব নাকি ব্যবস্থার ত্রুটি?
ডোমকলের মানবাধিকার কর্মী আব্দুল গনি জানিয়েছেন, ডোমকলের এই ঘটনাটি চিকিৎসাব্যবস্থার একটি অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করেছে। একদিকে চিকিৎসকের দাবি অনুযায়ী শিশুর শারীরিক জটিলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু অন্যদিকে ৫ ঘণ্টার অবহেলা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো শিশুটিকে দেখে প্রাথমিক অক্সিজেন বা নেবুলাইজেশনের ব্যবস্থা করত কিংবা সময় থাকতে সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দিত, তবে হয়তো একটি মায়ের কোল খালি হতো না। গনির আরও বক্তব্য, চিকিৎসা কেবল বিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি মানবিকতারও বিষয়। ‘সিরিয়াল’ নামক যান্ত্রিকতার চাপে পড়ে যখন একটি প্রাণ হারায়, তখন সেই ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ডোমকলের এই ঘটনা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে কেবল জাঁকজমক থাকলেই চলে না, মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় তৎপরতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা একান্ত প্রয়োজন।
