TOP NEWS

স্বাধীনতা রাষ্ট্রের উপহার নয়, বরং তার প্রথম দায়িত্ব: পাসপোর্টের অধিকার নিয়ে বলল সুপ্রিম কোর্ট

(Supreme Court of India || File Photo)

ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোয় ব্যক্তিস্বাধীনতা রাষ্ট্রের দেওয়া কোনও দান নয়, বরং তা রাষ্ট্রের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব—এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল দেশের শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চললেও তা পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না। সোমবার কয়লা সংক্রান্ত একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত এবং অন্য একটি কয়লা খনন মামলায় ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত মহেশ কুমার আগরওয়ালের পাসপোর্ট নবীকরণ সংক্রান্ত আবেদনের শুনানিতে এই মন্তব্য করে বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি এজি মাসিহের বেঞ্চ। এদিন আদালত বলেছে, “আমাদের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় স্বাধীনতা রাষ্ট্রের উপহার নয়, বরং তার প্রথম দায়িত্ব। আইনের অধীন থেকে নাগরিকের চলাফেরা, ভ্রমণ, জীবিকা ও সুযোগ অনুসরণের স্বাধীনতা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে সুরক্ষিত অধিকার। ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে রাষ্ট্র প্রয়োজনে এই স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ হতে হবে প্রয়োজনীয়, সংগত এবং আইনের ভিত্তিতে।”

জানা যায়, মহেশ কুমার আগরওয়ালের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয় ২০২৩ সালের আগস্টে। তার আগেই ইউএপিএ মামলায় রাঁচির এনআইএ আদালত শর্ত চাপিয়ে তার পাসপোর্ট নবীকরণের অনুমতি দেয়। নবীকৃত পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখতে হবে ও আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশে যাওয়া যাবে না বলে শর্ত দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সিবিআইয়ের কয়লা মামলায় দণ্ড স্থগিত করা দিল্লি হাইকোর্টও ১০ বছরের জন্য পাসপোর্ট নবীকরণে ‘নো অবজেকশন’ দেয়। তবে বিদেশযাত্রায় আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক রাখে। এই নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ফৌজদারি মামলা চলার যুক্তিতে পাসপোর্ট আইনের ৬(২)(এফ) ধারা প্রয়োগ করে নবীকরণে অস্বীকার করে। কলকাতা হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়। সোমবার সুপ্রিম বেঞ্চ জানিয়েছে, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা যখন কঠোর বাধায় পরিণত হয় অথবা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকালের জন্য বহাল থাকে, তখন রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও ব্যক্তির মর্যাদার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এদিকে শীর্ষ আদালত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও আইনি অবস্থান বিবেচনা করে জানায়, পাসপোর্ট আইনের ৬(২)(এফ) ধারা ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়। যদি সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে পাসপোর্ট ইস্যু বা ব্যবহারের অনুমতি দেয় এবং অভিযুক্ত আদালতে হাজির থাকার অঙ্গীকার করেন, তবে পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে।

বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি এজি মাসিহের বেঞ্চ বলেছে, “কলকাতা হাইকোর্ট অত্যন্ত সংকীর্ণ ব্যাখ্যা করেছে। পাসপোর্ট নবীকরণের অনুমতি মানেই প্রতিবার নির্দিষ্ট বিদেশযাত্রার ছাড়পত্র দিতে হবে—এমন কোনও বিধান আইনে নেই। আদালত চাইলে পাসপোর্ট নবীকরণের অনুমতি দিয়ে প্রতিটি বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে আগাম অনুমতির শর্ত বজায় রাখতে পারে।” শীর্ষ আদালত আরও জানায়, পাসপোর্ট নবীকরণের সময় ভবিষ্যৎ ভ্রমণসূচি বা ভিসার বিবরণ চাওয়া পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়। তাদের কাজ হলো—আদালত অভিযুক্তের ক্ষেত্রে ভ্রমণের সম্ভাবনা নজরদারির আওতায় খোলা রেখেছে কি না, তা দেখা।

পাসপোর্ট থাকা এবং বিদেশযাত্রার অনুমতির মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট করেছে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, পাসপোর্ট একটি নাগরিক নথি, যা ভিসা চাওয়া ও সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগ দেয়। কিন্তু কোনও ব্যক্তি বিদেশে যাবেন কি না, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা ফৌজদারি আদালতের। কেবল আশঙ্কার ভিত্তিতে পাসপোর্ট নবীকরণে অস্বীকৃতি জানানো মানে ফৌজদারি আদালতের ঝুঁকি মূল্যায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এরপরই সব দিক বিবেচনা করে আগরওয়ালকে ১০ বছরের জন্য সাধারণ পাসপোর্ট পুনরায় ইস্যু করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। তবে আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই পাসপোর্ট রাঁচির এনআইএ আদালত ও দিল্লি হাইকোর্টের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব নির্দেশের অধীন থাকবে। আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না এবং প্রয়োজনে পাসপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!