TOP NEWS

ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিককে ‘খুন’, রণক্ষেত্র বেলডাঙা: জাতীয় সড়ক ও রেল অবরোধ

নিজস্ব সংবাদদাতা, বেলডাঙা: ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ফের প্রাণ হারালেন বাংলার এক পরিযায়ী শ্রমিক। ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের এক যুবককে ‘বাংলাদেশি’ অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে খুনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুক্রবার সকাল থেকেই রণক্ষেত্রের চেহারা নিল বেলডাঙা। দফায় দফায় জাতীয় সড়ক অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং রেললাইন স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় জেলাজুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় পুলিশ প্রশাসনকে। ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ময়দানে নেমেছেন প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরীও।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: ‘বাংলাদেশি’ তকমা ও রহস্যমৃত্যু

নিহত শ্রমিকের নাম আলাউদ্দিন শেখ ওরফে আলাই শেখ (৩০)। তিনি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার অন্তর্গত সুজাপুর কুমারপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সুজাপুর তালপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে উপার্জনের তাগিদে ঝাড়খণ্ডে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন আলাউদ্দিন। গ্রামগঞ্জে ঘুরে জিনিস বিক্রি করতেন তিনি। তবে গত কয়েকদিন ধরেই তিনি বাড়িতে ফোন করে আতঙ্কের কথা জানাচ্ছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, বাঙালি হওয়ার কারণে তাঁকে সেখানে বারংবার হেনস্থা করা হচ্ছে। এমনকি স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতী তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিয়ে হুমকি দিচ্ছিল।

বৃহস্পতিবার বিকেলে শেষবার পরিবারের সঙ্গে কথা হয় আলাউদ্দিনের। এরপর থেকে তাঁর মোবাইল ফোনটি বন্ধ ছিল। শুক্রবার সকালে ঝাড়খণ্ডের ভাড়াবাড়ি থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের খবর পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে গোটা পরিবার। কিন্তু পরিবার ও প্রতিবেশীদের দাবি, এটি কোনও আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আলাউদ্দিনের মা সোবা বিবি অভিযোগ করেন, “ওকে দুষ্কৃতীরা বেধড়ক মারধর করে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলেছে। তারপর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যা বলে সাজিয়ে দেহটি ঝুলিয়ে দিয়েছে।” পরিবারের অভিযোগ, নিছক জাতিগত বিদ্বেষ ও ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়েই তাঁকে টার্গেট করা হয়েছিল। এই ঘটনা নিয়ে ঝাড়খণ্ডের পালামু জেলার পুলিশ সুপার রিশ্মা রামেসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

অবরুদ্ধ জাতীয় সড়ক ও রেললাইন

শুক্রবার ভোরে এই খবর বেলডাঙায় পৌঁছাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। ঝাড়খণ্ডে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের উপর বারংবার আক্রমণের অভিযোগ তুলে ডালখোলা-বকখালি ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন কয়েক হাজার মানুষ। রাস্তার উপর টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগের এই প্রধান ধমনীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার গাড়ি আটকে পড়ে। উত্তরবঙ্গগামী বাস ও জরুরি পরিষেবার গাড়িগুলো তীব্র যানজটে নাকাল হয়।

বিক্ষোভের আঁচ পড়ে রেলপথেও। বেলডাঙা স্টেশনে রেললাইনে বাঁশ ফেলে এবং লাইনের উপর বসে পড়ে অবরোধ শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। এর ফলে শিয়ালদহ-লালগোলা শাখায় ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার যাত্রী স্টেশনে আটকে পড়েন। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, মুখ্যমন্ত্রীকে নিজে এসে দেখা করতে হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ

পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ। তিনি আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আমরা এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছি। খুনের সাথে যারা জড়িত, তাদের যেভাবেই হোক গ্রেপ্তার করা হবে।” পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছান জেলা শাসক নিতীন সিংহানিয়া। তিনি নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরির দেওয়া আশ্বাস দেন।

বিকেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তিনি শোকার্ত পরিবারের সাথে কথা বলেন এবং ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। অধীর বাবু বলেন, “ভারতের যে কোনও প্রান্তে গিয়ে কাজ করার অধিকার মানুষের রয়েছে। আরএসএস ও বজরং দলের ক্যাডাররা বাংলাভাষী মানুষের উপর আক্রোশ ও ঘৃণা ছড়াচ্ছে। রাজ্য সরকারের উচিত ভিন রাজ্যে আমাদের শ্রমিকদের সুরক্ষায় একজন ওয়েলফেয়ার অফিসার নিয়োগ করা।”

অন্যদিকে, তৃণমূল নেতৃত্বও এই ঘটনায় কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি ফোন করেন ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের কড়া শাস্তির দাবি জানান। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী অভিষেককে আশ্বস্ত করেছেন যে, পুলিশ ইতিমিধ্যেই সক্রিয় হয়েছে এবং অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না।

মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন ও পরিস্থিতির উপশম

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বেলডাঙার মানুষকে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানান। তাঁর নির্দেশে প্রশাসনের পদস্থ কর্তারা আন্দোলনকারীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেন। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনার পর, জেলা পুলিশ সুপার ও জেলাশাসকের আশ্বাসে অবরোধ ওঠে। মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের এক সদস্যকে সরকারি চাকরি এবং পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রশাসন। এই আশ্বাসের পরেই বেলডাঙার রেললাইন ও জাতীয় সড়ক থেকে অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা। সন্ধ্যায় ধীরে ধীরে যান চলাচল ও ট্রেন পরিষেবা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

এই ঘটনা আবারও ভিন রাজ্যে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, জাতিগত ও ভাষাগত বিদ্বেষ যেভাবে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তা গণতন্ত্রের পক্ষে অশনি সংকেত।

2 thoughts on “ঝাড়খণ্ডে মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিককে ‘খুন’, রণক্ষেত্র বেলডাঙা: জাতীয় সড়ক ও রেল অবরোধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!