সুরাইয়া সুমি সরকার: নির্বাচন কমিশনের নিবিড় সংশোধনীর জাঁতাকলে মানুষের জীবন কীভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে, তার এক মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল মুর্শিদাবাদের ডোমকলে। যে চোখে কোনোদিন পৃথিবীর আলো পৌঁছায়নি, সেই জন্ম-অন্ধ চোখে এখন ঘুম কেড়ে নিয়েছে ‘এক টুকরো কাগজ’। ৪২ বছর বয়সী আলম মণ্ডল, যাঁর দিন কাটে দু’বেলা ভিক্ষা করে, আজ তাঁকে লড়াই করতে হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার শুনানির নোটিশ হাতে নিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে দৃষ্টিহীন আলম মন্ডল। অনাথ দৃষ্টিহীন অসহায় ব্যক্তিকে নোটিশ ধরানোর ঘটনায় বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা প্রশ্ন তুলছেন, “প্রশাসনের কি মানবিকতা বলে কিছু নেই?”
দৃষ্টিহীন ব্যক্তিকে শুনানির নোটিশ
ডোমকল পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের গোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা আলম মণ্ডল জন্মের পর থেকেই দৃষ্টিহীন। দৈনন্দিন জীবন থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ—সবই তাঁকে করতে হয় অন্যের সাহায্য নিয়ে। পরিবারের দশ ভাই-বোনের মধ্যে দুই ভাই মারা গিয়েছেন, দুই বোন অন্যত্র বিবাহিত, বাকিরা নিজ নিজ সংসারে ব্যস্ত। বাবা-মা জীবনাবসান হয় বহু বছর আগে। এরপর থেকে আলম কার্যত সমাজের উপেক্ষার মধ্যে বেঁচে আছেন। জীবিকা না থাকায় শেষ পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তির পথেই ঠাঁই হয় তাঁর।
এই পরিস্থিতিতেই গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) তাঁকে শুনানির নোটিশ ধরানো হয়। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী তিনি ডোমকল বিডিও অফিসের হিয়ারিং সেন্টারে (শুনানি কেন্দ্র) উপস্থিত হন। সেখানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু তাঁর কাছে ছিল শুধুমাত্র আধার ও রেশন কার্ড। দুটি কাগজই সেখানে জমা দেন তিনি। হিয়ারিং শেষে হতাশ গলায় আলম বলেন, “এই দেশেই জন্মেছি। আজ এক টুকরো কাগজের জন্য আমাকে এভাবে এদিক-ওদিক দৌড়তে হচ্ছে। বাবা-মা মারা গেছে বহুদিন। আমি তো কোনওদিন স্কুলেও যাইনি—স্কুল সার্টিফিকেট কোথায় পাব? আমাদের সময়ে জন্ম সার্টিফিকেটও ছিল না।” এরপরই আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “এভাবে হেনস্থা করার থেকে জেলে ভরে দিক। অন্তত দু’বেলা ভাত নিশ্চিন্তে পাব।”
অন্ধত্ব, অনাথতা, এবং নাগরিকত্বের কাগজ
স্থানীয়দের মতে, জন্ম থেকে প্রতিবন্ধকতা, পরিবারহীনতা, দারিদ্র্য, শিক্ষাবঞ্চনা এবং সামাজিক অবহেলা—সবই তাঁর জীবনের অংশ। এ অবস্থায় একাধিক ধরণের জটিল নথি সংগ্রহ করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
জানা যায়, আলমের ছোট ভাই জয়নাল আবেদীন অবিবাহিত হওয়ার কারণে তাঁকে যতটা সম্ভব দেখভাল করেন। তাঁকেও শুনানির নোটিশ ধরানো হয়। কমিশনের নোটিশ পাওয়ার পরই তিনি কাগজপত্রের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। তাঁর কথায়, “১৩ জানুয়ারি আমাদের দুই ভাইকেই নোটিশ দেওয়া হয়। আমি স্কুলে পড়েছি বলে নিজের কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি। কিন্তু দাদা কোনওদিন স্কুলে যায়নি—ওর কাগজ কোথা থেকে দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না।” জয়নাল ডেইলি ডোমকল-কে বলেন, তাদের পরিবারে ১৯৪৭ এবং ১৯৬২ সালের জমির দলিল রয়েছে, এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে প্রচলিত ‘ডোল’ নামের নথিও সংরক্ষিত রয়েছে।
এসআইআর নিয়ে কমিশনের দ্বিচারিতা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন জয়নাল আবেদীন। তাঁর বক্তব্য, “কমিশন আগে জানিয়েছিল, যাদের বাবা-মায়ের নাম ২০০২ সালের তালিকায় রয়েছে, তাদের কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো—২০০২ তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও নোটিশ ধরানো হচ্ছে, বানানগত ভুলের নামে নোটিশ আসছে, এবং বয়স্ক-প্রতিবন্ধী-অসহায়দের উপরও একই নিয়ম প্রয়োগ হচ্ছে।”
কেন নোটিশ পেলেন আলম?
প্রশাসন সূত্রে খবর, বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর (আলম মন্ডল) বয়সের ব্যবধানের অস্পষ্টতা এবং তথ্যে গড়মিলের কারণে নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে। ডোমকলের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (এইআরও) সামসুন নাহার ডেইলি ডোমকল-কে জানিয়েছেন, “বয়সগত অসঙ্গতি থাকায় বিষয়টি যাচাই প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া: ‘মানবিকতা নেই’
পরিস্থিতি জানার পর এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, “একজন দৃষ্টিহীন ভিক্ষুককে কাগজপত্র জোগাড় করতে বলা হচ্ছে—এটা অমানবিক। কমিশন কি কোনও ব্যতিক্রম রাখবে না?” তাদের মতে, এসআইআর এখন এমন মানুষের ওপরও নেমে এসেছে যাদের জীবনে কাগজপত্র সংগ্রহের সামর্থ্য নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ, প্রান্তিক ও বঞ্চিত মানুষেরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মনে করেন, যাচাইয়ের নামে আসলে হয়রানি করা হচ্ছে।
এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ
শুরু থেকেই এসআইআর বাতিলের দাবি তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনের ডোমকল শাখার সম্পাদক আব্দুল গনি জানান, গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া অসাংবিধানিক ও অপরিকল্পিত। তাঁর বক্তব্য, “এখন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠেছে। হাজারে হাজারে মানুষকে নোটিশ ধরানো হচ্ছে, এবং মূল টার্গেট সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।” তিনি ডেইলি ডোমকল-কে আরও বলেন, “এটি মূলত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ—যার উদ্দেশ্য ভোটাধিকার সংকুচিত করা এবং আতঙ্ক তৈরী করা।”
ডোমকলের বিশিষ্টদের একাংশ বলছেন, এটি কেবল একটি নোটিশ নয়—বরং রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার নাগরিকত্ব পরীক্ষা। প্রান্তিক মানুষ, যাদের কাছে ভোটাভিকের সময় রাজনৈতিক দলগুলো পৌঁছে যায়, পরে তাদের ওপরই নাগরিকত্ব বা পরিচয় যাচাইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এটাই এখন অনেকের উপলব্ধি। এই প্রক্রিয়া মানুষকে হেনস্থা করা ছাড়া আর কিছু নয়। অসাংবিধানিক এসআইআর বন্ধ হোক এবং নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হোক।
