ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: দেখতে দেখতে কেটে গেল একটি বছর। কিন্তু আজও আহমেদাবাদের আকাশে কোনো বিমানের গর্জন শুনলে শিউরে ওঠেন মেঘানীনগরের বাসিন্দারা। এক বছর আগে আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ যাত্রীবাহী বিমানটি। দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই বিমান দুর্ঘটনায় ২৬০ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্যের সকলেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। আজ এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনহারা পরিবারগুলির কান্না থামেনি, বেঁচে যাওয়া মানুষের ট্রমা কাটেনি, আর সবচেয়ে বড় কথা—কী কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছিল, তার কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা আজও দেশবাসীর সামনে আসেনি।
এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে মোব্বাশেরা ভাহোরার ওপর। তাঁর স্বামী পারভেজ ভাহোরা এবং চার বছরের কন্যাসন্তান জুভেরিয়া স্রেফ আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে লন্ডন থেকে ভারতে এসেছিলেন। ফেরার পথে আহমেদাবাদে ওই অভিশপ্ত বিমানে ওঠেন তাঁরা। সেই সময় মোব্বাশেরা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় লন্ডনে অপেক্ষা করছিলেন। এক বিকেলে তাঁর পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়। পারভেজের আত্মীয় ফারুক ভাই স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একটি বছর কেটে গেল, কিন্তু একটা তরতাজা যুবক আর একটা ছোট্ট শিশু চলে গেল। এই ক্ষত কোনোদিন ভরার নয়।” মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মোব্বাশেরা পরে লন্ডনের একাকীত্ব ছেড়ে গুজরাটের তারাপুরে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে ফিরে আসেন এবং সেখানে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। ফারুক ভাইয়ের কথায়, “জীবনটাই পুরোপুরি বদলে গেছে। ঘর খালি বলাটা খুব ছোট শব্দ, পুরো জীবনটাই শূন্য হয়ে গেছে।” কেবল বিমানে থাকা যাত্রীরাই নন, মাটিতে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনও ছারখার করে দিয়েছিল এই দুর্ঘটনা। বিমানের পতনের পর মেঘানীনগর হোস্টেল কমপ্লেক্সের কাছে থাকা একটি চায়ের দোকানে আগুন ধরে যায়। স্থানীয় চালক সুরেশ পাটানি জানান, তাঁর কিশোর ছেলে আকাশ সেই আগুনে পুড়ে মারা যায়। আজও চোখের সামনে ছেলের সেই অবয়ব দেখতে পান তিনি।
দুর্ঘটনার সময় রাস্তা দিয়ে স্কুটার চালিয়ে যাচ্ছিলেন ২৮ বছর বয়সী তরুণ অজয় পারমার। আচমকা বিকট শব্দ এবং পরক্ষণেই বিমানের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েন তিনি। কোনোমতে প্রাণ বাঁচলেও তাঁর হাত-পা ও শরীর আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। সিভিল হাসপাতালে দু-মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এলেও, আজ তিনি জীবন্ত লাশ। চিকিৎসকরা তাঁকে কড়া রোদে কাজ করতে নিষেধ করায় মালির চাকরিটি ছাড়তে হয়। পুড়ে যাওয়া বিকৃত চেহারা এবং কর্মহীনতার কারণে বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। অজয় বলেন, “আমি একটা অফিস চাকরি খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু দুপুরের খাওয়ার সময় সহকর্মীরা আমার থেকে দূরে বসত। কেউ আমার এই পোড়া দাগগুলো দেখতে চায় না।” বর্তমানে তাঁর গৃহপরিচারিকা মায়ের আয়ে কোনোমতে দিন কাটছে অজয়ের।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ আজও ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ডিজিসিএ)-র ফাইলের স্তূপে বন্দি রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে বোয়িং ৭৮৭-র ‘ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ মেকানিজম’ বা জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল। এয়ার ইন্ডিয়ার পুরো বোয়িং ৭৮৭-৮ এবং ৭৮৭-৯ বহর পরিদর্শন করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েনি। চূড়ান্ত নিরাপত্তা রিপোর্ট না আসায় ধোঁয়াশা কাটেনি।
বিপর্যয়ের পর এয়ার ইন্ডিয়া এবং তার অভিভাবক সংস্থা টাটা সন্স মানবিক দিক থেকে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ডিএনএ সনাক্তকরণ এবং শেষকৃত্যের প্রক্রিয়া সহজ করতে ৫০০-রও বেশি স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়েছিল। মৃতদের ৯৬ শতাংশ পরিবারের কাছে ইতিমধ্যেই ২৫ লক্ষ টাকা করে অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে ‘এআই১৭১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর মাধ্যমে পরিবার প্রতি ১ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন, যা ইতিমধ্যেই ৯১ শতাংশ পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। তবে কুণাল আগরওয়ালের মতো কিছু আত্মীয় জানিয়েছেন, এই ক্ষতিপূরণের নিষ্পত্তিতে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ২২,০০০-এর বেশি ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের মধ্যে ১৬টি ডিজিটাল ডিভাইস কঠোর স্ক্রিনিংয়ের পর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ২০১৫ সালের জুনে এয়ার ইন্ডিয়া একটি স্বেচ্ছামূলক ‘নিরাপত্তা বিরতি’ নিয়েছিল এবং তাদের ‘ওয়েলনেস.এআই’ উদ্যোগের অধীনে ২৬৫ জন মনস্তাত্ত্বিক নিয়োগ করে ৯০০-র বেশি কেবিন ক্রু ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে মানসিক কাউন্সেলিং প্রদান করেছে।
কর্পোরেট পরিসংখ্যান, কোটি টাকার অনুদান বা বিমানের পরিকাঠামোগত সংস্কার—কোনো কিছুই শূন্য চেয়ারগুলোর হাহাকার মুছতে পারবে না। এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১-এর প্রথম বর্ষপূর্তিতে আসল সত্যিটা কোনো নথিতে নয়, লুকিয়ে আছে তারাপুরের সেই নিঝুম বাড়িতে, যেখানে এক মা তাঁর সদ্যোজাত ছেলেকে কোলে নিয়ে ভাবছেন—বড় হলে কীভাবে বোঝাবেন, এক বছর আগের সেই একটা বিমান দুর্ঘটনা তাঁদের জীবন থেকে কী কেড়ে নিয়েছে।
