TOP NEWS

‘গাজা থেকে মুসলিমদের মুছে ফেলা হোক’, গণহত্যায় মদদকারী ব্যক্তির ছেলেই মার্কিন হামলায় নিহত

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে, এক বাবা সামাজিক মাধ্যমে তাঁর নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আবেগঘন পোস্টটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হলো এক নজিরবিহীন বিতর্ক। নিখোঁজ নাবিকের বাবা রাজেশ শর্মার অতীতে করা মুসলিম-বিদ্বেষী এবং চরম উগ্র মন্তব্যগুলির স্ক্রিনশট সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

জানা যায়, হিমাচল প্রদেশের বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী তরুণ আদিত্য শর্মা ‘এমটি সেত্তেবেলো’ নামের পালাউ-পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কারে কর্মরত ছিলেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যে ৩ জন ভারতীয় নাবিক প্রাণ হারান, আদিত্য ছিলেন তাঁদেরই একজন। ওই জাহাজ থেকে অপর ২১ জন ভারতীয় ক্রু সদস্যকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

আদিত্য শর্মার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার আগেই তাঁর বাবা রাজেশ শর্মা শিপিং কোম্পানির পাঠানো একটি বার্তার উল্লেখ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাঁর ছেলেসহ ৩ জন নিখোঁজ। তিনি ছেলের সন্ধানে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানান। তবে এই পোস্টটি ভাইরাল হতেই, নেটিজেনদের একটি বড় অংশ রাজেশের পুরনো বেশ কিছু এক্স ও ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট সামনে নিয়ে আসে। যেখানে দেখা যায়, অতীতে তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং সহিংস মন্তব্য করেছিলেন।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সময় রাজেশ শর্মা লিখেছিলেন, “আমার মনে হয় ইসরাইলের এখন উচিত পুরো গাজা থেকে জাতিগত নিধন চালানো এবং এটিকে একটি অ-মুসলিম ভূখণ্ডে পরিণত করা। সেখানে শান্তি বজায় রাখার এটাই একমাত্র উপায়।” একই সাথে তিনি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও সেনাদল আইডিএফ-এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। অন্য একটি পোস্টে তিনি দাবি করেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীর শেষের মধ্যে “বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম হয় নির্মূল হয়ে যাবে, না হয় কোনো শান্তিপূর্ণ ধর্মে ধর্মান্তরিত হবে।” এছাড়া হিজাব ও বোরকা পরিহিত মুসলিম নারীদের নিয়েও তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন বলে স্ক্রিনশটে দাবি করা হয়েছে।

এই পোস্টগুলি সামনে আসতেই নেটিজেনদের একাংশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যিনি নিজে সোশ্যালে এভাবে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে পারেন, আজ নিজের ট্র্যাজেডির দিনে তিনি কীভাবে সহানুভূতির আশা করেন? তবে একাংশ আবার এই কঠিন সময়ে একটি পরিবারের শোককে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন।

ছেলের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর শোকস্তব্ধ পরিবারটি এখন এই নৃশংস হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে জবাবদিহিতা ও বিচারের দাবি তুলেছে। রাজেশ শর্মা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে জাহাজে থাকা এক শীর্ষ কর্মকর্তার দ্বারা ক্রমাগত মানসিক ও পেশাগত হেনস্থার শিকার হচ্ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে জাহাজে সিনিয়রদের মাধ্যমে শোষিত হওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং গত এপ্রিল মাসেই এই জাহাজ ছেড়ে চলে আসতে চেয়েছিল। আমার কাছে ওদের কথোপকথনের সমস্ত রেকর্ড রয়েছে।”

একটি বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আমেরিকার এমন প্রাণঘাতী সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে রাজেশ শর্মা একে একটি ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজ পরীক্ষা করার বা থামানোর আরও অনেক পথ ছিল, এভাবে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে নিরীহ মানুষদের মেরে ফেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি ভারত সরকারকে আমেরিকার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে কড়া অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। আদিত্যের কাকা হিমাংশু শর্মাও এই আক্রমণকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং অবিলম্বে নিহত তরুণ নাবিকের নশ্বর দেহাবশেষ হিমাচল প্রদেশের দেশের বাড়িতে দ্রুত ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!