ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে কেরালার তিনজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের (ভিসি) অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে এক বড়সড় রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে উপাচার্যদের যোগদান নিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন এবং বিরোধী দলনেতা পিনরাই বিজয়ন উভয়েই একযোগে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন কেরালার তিন শীর্ষ শিক্ষাবিদ—ডা. মোহনন কুন্নুম্মল (কেরালা ইউনিভার্সিটি অফ হেলথ সায়েন্সেস), ডা. মাভুথু ডি (মহাত্মা গান্ধী ইউনিভার্সিটি) এবং ডা. সি আর প্রসাদ (মালায়লাম ইউনিভার্সিটি)—সরাসরি আরএসএস-এর ওই কর্মসূচিতে যোগ দেন, যেখানে মূল বক্তা ছিলেন সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত।
এই ঘটনাটিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে বর্ণনা করেছেন কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান বিরোধী দলনেতা পিনরাই বিজয়ন। তিনি বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ কেরালা এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। বামপন্থী নেতার অভিযোগ, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সংঘ পরিবারের এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, উপাচার্যদের এই উপস্থিতি তারই এক বাস্তব ও স্পষ্ট উদাহরণ। বিগত এলডিএফ (LDF) সরকার আইন প্রণয়ন, আইনি হস্তক্ষেপ এবং গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘গৈরিকীকরণ’ (Saffronisation)-এর সমস্ত প্রচেষ্টাকে রুখে দিয়েছিল। কিন্তু গত ১৮ মে রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বামপন্থীদের সেই সতর্কতা ও প্রতিরোধ আজ গায়েব।” একই সাথে এই বিষয়ে বর্তমান ইউডিএফ (UDF) সরকারের ‘নীরবতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে কড়া সমালোচনা করেন বিজয়ন।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নিচ্ছেন না কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কড়া বিবৃতিতে তিনি এই ঘটনাকে উপাচার্যদের এক “গুরুতর গাফিলতি” এবং তাঁদের পদের মর্যাদার পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী সতীশন স্পষ্ট ভাষায় জানান, “কেরালার মানুষ উপাচার্য পদটিকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখে। চরম সাম্প্রদায়িকতার প্রচার করা একটি সংগঠনের প্রধানের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তাঁরা সেই সম্মানকে কালিমালিপ্ত করেছেন। যে কেউই হোক না কেন, সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো কোনো আচরণ কেরালার মাটিতে বরদাস্ত করা হবে না।” মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য তিন উপাচার্যকেই কেরালার সাধারণ মানুষের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী শিবিরের এই আক্রমণের মুখে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিজেপি। কেরালা বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাজীব চন্দ্রশেখর মুখ্যমন্ত্রী সতীশনকে “ভণ্ড” বলে কটাক্ষ করেন এবং এই সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতার সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে চন্দ্রশেখর লেখেন, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (IUML) এবং জামায়াত-ই-ইসলামীর মতো সংগঠনের সমর্থনের ওপর টিকে থাকা সরকারের অন্য কাউকে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সাংবিধানিক মূল্যবোধ নিয়ে জ্ঞান দেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। কংগ্রেস এবং সিপিআই(এম) দুজনেই এখানে তুষ্টিকরণের রাজনীতি করছে। আরএসএস প্রধানের একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার অপরাধে উপাচার্যদের হুমকি ও ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, বিজেপি বা আরএসএস-এর জুজু দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে ভোট টানার দিন এবার শেষ। কেরালার মানুষ কোনো ভয় না পেয়ে নিজেদের জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রকাশ করে যাবেন এবং দেশের স্বার্থে কাজ করা নেতাদের পাশেই দাঁড়াবেন।
এদিকে, তিন উপাচার্যের এই পদক্ষেপ এবং তা নিয়ে শুরু হওয়া রাজনৈতিক দ্বৈরথ আগামী দিনে কেরালার শিক্ষা ও রাজনৈতিক মহলকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
