কেন ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা ছাড়াই অনশন ভাঙলেন সোনাম ওয়াংচুক?

(Photo Credit: Screenshot/YT@Sonam Wangchuk)

ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দীর্ঘ ২৬ দিন ধরে চলা অনশন অবশেষে ভঙ্গ করলেন বিশিষ্ট সামাজিক ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তিনি অবিচল থাকলেও, শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর ইস্তফা সংক্রান্ত কোনো আশ্বাস পাননি। তা সত্ত্বেও কেন অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেন ওয়াংচুক? তা এক ১১ মিনিট ২২ সেকেন্ডের দীর্ঘ ভিডিও বার্তায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন পরিবেশকর্মী। সোনাম ওয়াংচুক জানান, কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরেই তিনি আন্দোলন স্থগিত করার পদক্ষেপ নেন। লিখিত প্রতিশ্রুতিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

অনশনের ২৪তম দিনেই আন্দোলন তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও ওয়াংচুক আরও দু’দিন অনশন চালিয়ে যান। তাঁর স্পষ্ট দাবি ছিল—সরকারের দেওয়া মুখে মুখে আশ্বাস যথেষ্ট নয়, পুরো বিষয়টি লিখিত আকারে দিতে হবে। ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক বলেন, “আজ ২৬তম দিনে আপনাদের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর শেয়ার করছি। রাত তখন প্রায় ১২:৩০টা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা, জিতেন্দ্র সিং এবং লাদাখের অ্যাপেক্স বডির শীর্ষ নেতারা এখানে এসেছিলেন। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ৬৫ জন সংসদ সদস্য স্বাক্ষর করে আমাদের অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান। তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন যে নিট প্রশ্নফাঁস ও সামগ্রিক পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে।” ওয়াংচুক বলেন, “গত দু’দিন ধরে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে আমাদের একপ্রকার দরকষাকষি চলছিল। আমি লিখিত প্রতিশ্রুতি চাচ্ছিলাম, আর তারা অন্যভাবে বিষয়টি মেটাতে চেয়েছিল। সেই কারণেই আমাকে বাড়তি দু’দিন অনশনে বসতে হয়। অবশেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা এসে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।”

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি—তা স্বীকার করেই সোনাম ওয়াংচুক নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের হিসাব-নিকাশ স্পষ্ট করেন। ওয়াংচুক জানান, তাঁর সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনশন চালিয়ে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করা, অথবা আন্দোলনে ইতিমধ্যেই যা অর্জন করা গেছে তাকে সুসংহত করা। তিনি বলেন, “হাজার হাজার সমর্থক ও সাধারণ মানুষ বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমাকে বোঝাচ্ছিলেন যে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য আমার বেঁচে থাকা জরুরি।” ওয়াংচুকের মতে, মন্ত্রীর পদত্যাগের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেন কোনো মামলা বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। তিনি যুক্তি দেন, শিক্ষামন্ত্রী ইস্তফা না দিলে তার রাজনৈতিক মাশুল সরকারকেই গুনতে হবে।

ওয়াংচুক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যদি শিক্ষামন্ত্রী ইস্তফা না দেন, তাতে শিক্ষার্থী বা আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না; ক্ষতি হবে সরকারের নিজেরই। এত ছোট একটা বিষয় এড়াতে গিয়ে তিনি নিজেরই রাজনৈতিক ক্ষতি করছেন। ইস্তফা দিলে এই ক্ষতি অনেক আগেই থামানো যেত। তবে আমার কাছে মন্ত্রীর পদত্যাগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না, ওটা সময়ের সাথে নিজে থেকেই সমাধান হয়ে যাবে। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যাতে আমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি মামলা দায়ের না করা হয়।” সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সোনাম ওয়াংচুক জানান, অনশন প্রত্যাহার হলেও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রাম থামবে না, এটি ভবিষ্যতেও জারি থাকবে।

 

কেন্দ্রের যে ৩টি লিখিত প্রতিশ্রুতির পর অনশন প্রত্যাহার

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কোনো আশ্বাস না পাওয়া সত্ত্বেও কেন ২৬ দিনের দীর্ঘ অনশন প্রত্যাহার করলেন, তার মূল কারণ প্রকাশ্যে আনলেন শিক্ষা ও পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক। তিনি জানান, কেন্দ্র সরকারের থেকে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওয়াংচুকের মতে, এই তিনটি প্রতিশ্রুতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় জয়।

১. আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আইনি সুরক্ষা

যন্তরমন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কিংবা গত ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ অভিযানে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আইনি পদক্ষেপ বা এফআইআর করা হবে না। সোনাম ওয়াংচুক জানান, “কেন্দ্র আজ লিখিত আশ্বাস দিয়েছে। যন্তরমন্তরে যারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিল কিংবা ২০ জুলাইয়ের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল, আমাদের সেই সব শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।”

২. নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ

নিট প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জেরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাণ হারানো ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত আর্থিক সাহায্য ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। ওয়াংচুক বলেন, “প্রশ্নফাঁসের এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণে যে ২০ জনেরও বেশি সন্তান প্রাণ হারিয়েছে, তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে সরকার।”

৩. সংসদে পরীক্ষা সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা

ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষার অনিয়ম না ঘটে, সে জন্য দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষা খাতে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদে বিস্তারিত বিতর্ক ও আলোচনার আয়োজন করা হবে।

সোনাম ওয়াংচুক বলেন, যে নৈতিকতার খাতিরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্তফার পেছনে পড়ে না থেকে—শিক্ষার্থীদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং সংসদে পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে স্থায়ী আলোচনার পথ তৈরি করাই তাঁর কাছে প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। তিনি মনে করেন, এই লিখিত প্রতিশ্রুতিগুলো অর্জিত হওয়ার পর অনশন দীর্ঘায়িত না করে আন্দোলনকে অন্য উপায়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!