সুরাইয়া সুমি সরকার: গত লোকসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফের নিজের গড় মুর্শিদাবাদে জনসংযোগে মরিয়া অধীর রঞ্জন চৌধুরী। বুধবার জলঙ্গিতে এক বিশাল মিছিলে অংশ নেওয়ার পর গরীবপুরের জনসভা থেকে একযোগে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানালেন বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ। পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা, এসআইআর (SIR) বিতর্ক এবং এনআরসি (NRC) নিয়ে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও তৃণমূলের ‘ভয়ের রাজনীতি’র বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। এদিন অধীর চৌধুরীর হাত ধরে শতাধিক কর্মী কংগ্রেসে যোগদান করেন।
এদিন জলঙ্গির মাটি থেকে ফের স্বমহিমায় গর্জে উঠলেন অধীর রঞ্জন চৌধুরী। জলঙ্গির জনসভা থেকে তিনি সাফ জানালেন, ভোট এলেই তৃণমূল ও বিজেপি সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে যে সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলে, তা আর চলতে দেওয়া হবে না। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বেলডাঙার দাঙ্গা— প্রতিটি ইস্যুতে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ শানিয়ে আগামীর লড়াইয়ের ডাক দিলেন কংগ্রেস নেতা।
এদিন জনসভার সভামঞ্চ থেকে অধীর রঞ্জন চৌধুরী অভিযোগ করেন, বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার, SIR-এর নামে মানুষের হেনস্থা, ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে “ষড়যন্ত্র” এবং ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার রাজ্য-ভারত সরকার মিলিতভাবে “চক্রান্ত” চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “এই জেলা থেকে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজের জন্য ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয়। সেখানে বাঙালি, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের শ্রমিকরা হামলা, হেনস্থা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অথচ রাজ্য সরকার তাদের পাশে দাঁড়ায় না।”
পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর হামলা, সরব অধীর
রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অধীর চৌধুরী বলেন, রুটি-রুজির টানে মুর্শিদাবাদের লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভিন রাজ্যে যেতে হচ্ছে। সেখানে তাঁরা ‘বাংলাদেশি’ অপবাদ ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। এদিন বক্তব্য দিতে গিয়ে অধীর চৌধুরী বলেন, হরিয়ানার পানিপথে ১৩৭টি মুসলিম শ্রমিক পরিবারকে “বাংলাদেশি” আখ্যা দিয়ে তাড়ানোর ঘটনা ঘটেছিল। খবর পেয়ে তিনি নিজে সেখানে গিয়ে প্রশাসন ও শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর দাবি, তার পর আর কোনও শ্রমিককে ওই এলাকায় সমস্যায় পড়তে হয়নি।
এছাড়া ওড়িশায় পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানাকে পিটিয়ে হত্যা করা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন কংগ্রেস নেতা। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে দেখা করে ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তার দাবি তুলে ধরেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “পুনরায় এমন হামলা হলে আন্দোলন হবে।” বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ সাফ বলেছেন, “আমি হেরেছি তাতে কি? জেলার মানুষের বিপদে আমি আগেও ছিলাম, আগামীতেও থাকব। মুর্শিদাবাদ থেকে তৃণমূলকে নিশ্চিহ্ন করাই আমাদের লক্ষ্য।”
রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ শানিয়ে অধীর প্রশ্ন তোলেন, “শ্রমিকরা যখন ভিন রাজ্যে মার খাচ্ছে, তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী কেন ওই সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন না? তৃণমূল সরকার শুধু শ্রমিকদের ভোট নিতে জানে, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই।” অধীরের অভিযোগ, “মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতির খেলায় ব্যস্ত। বাংলার শ্রমিক বাইরে মার খাচ্ছে, অথচ মুখ্যমন্ত্রী সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন না, কোনও ব্যবস্থা নেন না। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশায় সরকারের কোনও আগ্রহ নেই।”
বিজেপি-তৃণমূল ‘সেটিং’ ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ
অধীর চৌধুরী এদিন দাবি করেন, মোদি এবং দিদি নির্বাচনের সময় একে অপরের পরিপূরক হিসেবে নাটক শুরু করেন। তাঁর কথায়, “নির্বাচন এলেই একদিকে মোদি দিল্লি থেকে এসে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার কথা বলে হিন্দুদের এক হওয়ার ডাক দেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে বলেন বিজেপি এলে তোমাদের তাড়িয়ে দেবে, তাই আমাকে ভোট দাও। আসলে দুই পক্ষই দাঙ্গা আর সাম্প্রদায়িকতার তাস খেলে ভোট লুট করতে চায়।” নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশের সমালোচনা করে অধীর দাবি করেন, ভোট এলেই বিজেপি ও তৃণমূল সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে উস্কে দেয়। তাঁর কথায়, “একদিকে মোদি হিন্দু রাষ্ট্রের কথা বলেন। অন্যদিকে দিদি মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে বলেন, বিজেপি তাড়িয়ে দেবে।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন হোক কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানুষের সমস্যা নিয়ে। হিন্দু-মুসলমান নিয়ে নয়।”
মন্দির রাজনীতি নিয়ে কটাক্ষ
অধীর অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী বর্তমানে “হিন্দু ভোট ধরে রাখতে” রাজ্যে একাধিক মন্দির নির্মাণ করছেন এবং দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে সরকারি অর্থ দিচ্ছেন। “এদিকে শ্রমিকরা জীবন হাতে রেখে বাইরে কাজ করবে আর ভোটের সময়ে তাদের নিয়ে খেলা হবে,” দাবি তাঁর।
তৃণমূলকে নিশানা
গত লোকসভা নির্বাচনে নিজের হার প্রসঙ্গে অধীর চৌধুরী বিস্ফোরক অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তৃণমূল বুঝতে পেরেছিল সাধারণ প্রচারে তাঁকে হারানো সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনের ঠিক আগে বেলডাঙার শক্তিপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানো হয়েছিল। অধীরের দাবি, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচন কমিশনকে ফোন করে সেনাবাহিনী নামিয়ে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনেন। তাঁর অভিযোগ, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই তাঁকে হারানো হয়েছে যাতে তৃণমূল নেত্রীর উদ্দেশ্য সফল হয়।
জনসভায় অধীর চৌধুরী বলেন, “এই সভা বানচাল করতে তৃণমূল চেষ্টা করেছে। মাঠ হবে না, হবে না—করতে করতে গরীবপুরের মাঠে সভা করতে হল। আগামী দিনে মুর্শিদাবাদ থেকে তৃণমূল নিশ্চিহ্ন হবে।” তিনি প্রাক্তন নির্বাচন প্রসঙ্গও টেনে বলেন, তৃণমূল তাঁর বিরুদ্ধে “ষড়যন্ত্র করে” প্রার্থী দিয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে তাঁকে হারানোর চেষ্টা করেছে।
‘ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির দুর্বলতা বিপজ্জনক’
অধীরের বক্তব্য, “ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দুর্বল হলে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তোলে। ভারত তখনই শক্তিশালী হবে, যখন সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে। মানুষের অধিকার, কাজ ও মর্যাদার লড়াই থামবে না। কংগ্রেস মাঠে আছে।” এদিনের সভায় জেলা কংগ্রেস সভাপতি মনোজ চক্রবর্তীসহ জেলা ও ব্লকস্তরের নেতৃত্ব এবং হাজারো কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
