নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর: ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থা ও খুনের ঘটনায় গত দু’দিন অশান্ত হয়ে ওঠে বেলডাঙা। সাধারণ মানুষের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং বিক্ষোভের আবহে এবার সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিশেষ বার্তা দিলেন মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার (SP) কুমার সানি রাজ। এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আরও সংবেদনশীল হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, শুক্রবার পরিযায়ী শ্রমিককে খুনকাণ্ডে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বেলডাঙার আম জনতা। তুমুল বিক্ষোভ ও আন্দোলনে অবরুদ্ধ হয়েছিল ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক ও রেল পরিষেবা। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানায়। ব্যাপক বিক্ষোভের পরিস্থিতিতে বেলডাঙায় কয়েকজন সাংবাদিককে নিগৃহ করার অভিযোগ ওঠে। এনিয়ে সংবাদমহলও তীব্র নিন্দা জানায়। সাংবাদিক নিগৃহীত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ সুপার বলেন, সাংবাদিক নিগৃহের ঘটনায় আমরা দুঃখিত। ইতিমধ্যে আমরা মামলা রুজু করেছি, অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
Read More: শুক্রবারের বিক্ষোভ-আন্দোলন, শনিবারের বিক্ষোভ-আন্দোলন
এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জনগণের আবেগ ও ‘মব সাইকোলজি’ নিয়ে বেলডাঙার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “জেলার শ্রমিকরা যখন বাইরের রাজ্যে গিয়ে হেনস্থা ও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এমনকি প্রাণ হারাচ্ছেন, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতিতে প্রচুর মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন এবং সেখানে তাঁদের বড়সড় আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।”
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরামর্শ, উত্তপ্ত জনতা বা বিক্ষোভকারীদের থেকে প্রতিক্রিয়া (বাইট) নেওয়ার সময় ভাষার ব্যবহারে অত্যন্ত সংযমী হতে হবে। এসপি-র কথায়, “সাংবাদিকরা যখন কোনো ব্যক্তির সাথে কথা বলেন, তখন তিনি আসলে একজনের সাথে নয়, বরং গোটা বিক্ষোভকারী গোষ্ঠীর সাথেই কথা বলছেন। ভিড়ের মধ্যে নানা ধরণের মানুষ থাকেন। সেখানে কোনো উল্টো-পাল্টা বা উস্কানিমূলক প্রশ্ন পরিস্থিতিকে নেতিবাচক দিকে নিয়ে যেতে পারে।” পুলিশ সুপার বলেন, উত্তেজিত জনতার মধ্যে একজন হইহুল্লড় শুরু করলে নিমেষেই তা বড় আকার ধারণ করতে পারে। তাই সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সংবাদ পরিবেশনে কোনো বাধা নেই। কুমার সানি রাজের সাফ কথা, “যা ঘটছে তা নিয়ে খবর করুন, তাতে কেউ বাধা দেবে না। শুধু উস্কানিমূলক কথাবার্তা এড়িয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে কাজ করার আবেদন জানাচ্ছি।”
প্রসঙ্গত, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং একপেশে সাংবাদিকতা জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঘৃণা বা বিদ্বেষমূলক খবর সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বড়সড় সংকট তৈরি করতে পারে। বিগত দিনে কিছু নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যম পরিকল্পিতভাবে উস্কানিমূলক শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করে হিংসার আগুনে ঘিঁ ঢালার কাজ করেছে। তাদের লক্ষ্য সমাজকে বিভ্রান্ত করা এবং সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচার চালানো। এনিয়ে একাধিকবার সরব হয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এবার শান্তি বজায় রাখার স্বার্থেই সংবাদমাধ্যমকে তথ্যের সত্যতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পরামর্শ দিলেন মুর্শিদাবাদের জেলা পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ। এই ধরনের সাংবাদিকতা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং তা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা স্পষ্ট হল পুলিশের সুপারের কথায়।
এদিকে সংবাদমাধ্যমকে তাদের দায়িত্বের পাঠ দেওয়া নিয়ে পুলিশ সুপারের এই সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অনেকের মতেই, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে মিডিয়ার কাজ হওয়া উচিত সত্য প্রকাশ করা, ঘৃণা ছড়ানো নয়।
