TOP NEWS

সূর্যের মেজাজ তুঙ্গে: ধেয়ে আসছে আগুনের গোলক, মহাকাশে কি বড় বিপর্যয়ের সংকেত?

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: সূর্য যেন বর্তমানে প্রচণ্ড এক অগ্নিশর্মা মেজাজে। মহাকাশ থেকে একের পর এক ধেয়ে আসা শক্তিশালী সৌর শিখা (Solar Flare) পৃথিবীর দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করল বিশ্ব, যার ফলে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো উচ্চ সতর্কবার্তা জারি করেছে। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO) বর্তমানে তাদের অর্ধশতাধিক সক্রিয় উপগ্রহের নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত এবং প্রতিটি মুহূর্ত কড়া নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারির প্রথম দুই দিনে সূর্যের ‘অ্যাক্টিভ রিজিয়ন ১৪৩৬৬’ (Active Region 14366) নামক একটি অত্যন্ত জটিল সানস্পট বা সৌর কলঙ্ক অঞ্চল থেকে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া X8.1-ক্লাস ফ্লেয়ারটি ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ১৯৯৬ সালের পর থেকে রেকর্ড করা শীর্ষ ২০টি শক্তিশালী সৌর শিখার মধ্যে একটি।

সূর্যের এই ‘রাগের’ উৎস কী?

মহাকাশ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সূর্যের এই অস্থিরতার মূল কারণ হলো একটি অতি-সক্রিয় সৌর কলঙ্ক অঞ্চল—অ্যাক্টিভ রিজিয়ন ১৪৩৬৬। গত কয়েক দিনে এই অঞ্চলে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের তীব্র পরিবর্তনের ফলে একের পর এক চারটি প্রচণ্ড শক্তিশালী সৌর শিখা নির্গত হয়েছে। নাসার সোলার ডায়নামিক্স অবজারভেটরি (SDO) অত্যন্ত নিপুণভাবে এই বিস্ফোরণগুলো ক্যামেরাবন্দি করেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্য প্রতি ১১ বছর অন্তর একটি নির্দিষ্ট চক্রের মধ্য দিয়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘সোলার সাইকেল’। বর্তমানে সূর্য তার এই চক্রের সর্বোচ্চ শিখরে বা ‘সোলার ম্যাক্সিমা’ (Solar Maxima) পর্যায়ে রয়েছে। এই সময়ে সূর্যের পৃষ্ঠে বিস্ফোরণ এবং সৌর ঝড়ের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।

ভারত ও বিশ্বের ওপর এর প্রভাব

সৌর শিখা আসলে প্রচণ্ড শক্তির তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ, যা আলোর গতিতে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। যদিও এই বিকিরণ সরাসরি মানুষের শরীরের কোনো ক্ষতি করে না, তবে এটি আমাদের বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তর—আয়নোস্ফিয়ারকে (Ionosphere) প্রভাবিত করে। এর ফলে যে সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে:

রেডিও ব্ল্যাকআউট: উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। ১ ও ২ ফেব্রুয়ারির বিস্ফোরণের ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে সাময়িক রেডিও ব্ল্যাকআউট লক্ষ্য করা গেছে।

স্যাটেলাইট বিভ্রাট: কক্ষপথে থাকা উপগ্রহগুলোর সেন্সর এবং ইলেকট্রনিক্স ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জিপিএস বিভ্রাট: নেভিগেশন বা দিকনির্ণয় ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে, যা বিমান চলাচল ও জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিদ্যুৎ বিভ্রাট: অত্যন্ত শক্তিশালী সৌর ঝড় পৃথিবীর পাওয়ার গ্রিডকে অকেজো করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ইসরোর প্রস্তুতি ও নজরদারি

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা বর্তমানে তাদের ৫০টিরও বেশি সক্রিয় উপগ্রহ নিয়ে সজাগ রয়েছে। ইসরোর টেলিম্যাট্রি ট্র্যাকিং অ্যান্ড কমান্ড নেটওয়ার্ক (ISTRAC)-এর পরিচালক অনিল কুমার জানান, “রেডিও ব্ল্যাকআউটের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা প্রতিটি উপগ্রহকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি এবং যেকোনো ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুত।” গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো ইতিমধ্যে মিশন কন্ট্রোল সেন্টারগুলোতে সতর্কতা জারি করেছে। যদি কোনো উপগ্রহে অস্বাভাবিক কিছু দেখা দেয়, তবে তৎক্ষণাৎ বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা বা ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ (Contingency Plan) তৈরি রাখা হয়েছে।

ফ্রন্টলাইনে ভারতের ‘আদিত্য-এল১’

এই সৌর দুর্যোগ মোকাবিলায় ভারতের তুরুপের তাস হলো তার প্রথম সৌর মিশন—আদিত্য-এল১ (Aditya-L1)। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে ল্যাগরেঞ্জ পয়েন্ট ১-এ অবস্থান করে এই মহাকাশযানটি সূর্যকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আইআইএসইআর (IISER) কলকাতার সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ইন স্পেস সায়েন্সেস ইন্ডিয়া (CESSI)-এর অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দী জানান, “আদিত্য-এল১ রিয়েল-টাইমে সৌর বিকিরণ, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং চার্জড কণা পরিমাপ করছে। এটি আমাদের আগেভাগেই সতর্কতা দিতে সাহায্য করছে যাতে আমরা মহাকাশ পরিকাঠামো রক্ষা করতে পারি।”

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি: ন্যাশনাল লার্জ সোলার টেলিস্কোপ (NLST)

সূর্যের এই রহস্যময় আচরণ আরও গভীরভাবে বুঝতে ভারত সরকার একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ লাদাখের প্যাংগং লেকের তীরে ন্যাশনাল লার্জ সোলার টেলিস্কোপ (NLST) তৈরির ঘোষণা করেছেন। প্রায় ১০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হতে যাওয়া এই টেলিস্কোপটি হবে ২-মিটার ক্লাসের একটি অপটিক্যাল টেলিস্কোপ।

এটি লাদাখের উচ্চতাজনিত স্বচ্ছ আকাশকে ব্যবহার করে সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে। আদিত্য-এল১ মহাকাশ থেকে এবং এনএলএসটি (NLST) মাটি থেকে—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ভারত সৌর বিজ্ঞানে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

সতর্ক থাকাই এখন প্রধান লক্ষ্য

যদিও ১ ফেব্রুয়ারির সেই শক্তিশালী বিস্ফোরণের পর এখনও কোনো বিধ্বংসী করোনাল মাস ইজেকশন (CME) বা প্লাজমার মেঘ সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসতে দেখা যায়নি, তবে বিজ্ঞানীরা এখনই নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। অধ্যাপক নন্দীর মতে, যেহেতু এই সক্রিয় অঞ্চলটি এখনও সূর্যের পৃথিবীর মুখোমুখি অংশে রয়েছে, তাই বড় কোনো বিস্ফোরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সূর্য যেমন আমাদের প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি তার এই রুদ্ররূপ আধুনিক সভ্যতার প্রযুক্তিগত কাঠামোকে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই ইসরো এবং বিশ্বের অন্যান্য সংস্থাগুলো এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই এই সৌর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!