ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলোর (Foreigners Tribunal) কাজকর্ম এবং নথিপত্র সংরক্ষণের ধরন নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল গুয়াহাটি হাইকোর্ট। সম্প্রতি এক ব্যক্তির মামলার শুনানির সময় নথিপত্রের অসঙ্গতি খুঁজে পেতেই আদালতের প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাজ্য সরকারকে একগুচ্ছ কড়া প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে উচ্চ আদালত।
শিরাজুল হক নামে এক ব্যক্তি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের একটি রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর ভারতে আসা ‘বিদেশি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্ডের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন নথিপত্রের ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সামনে আসে। আদালত লক্ষ্য করে, ট্রাইব্যুনাল কিছু নথিকে ‘একজিবিট’ (Exhibit) হিসেবে চিহ্নিত করলেও চূড়ান্ত রায়ে সেগুলির উল্লেখ নেই। আবার কিছু নথিতে সদস্যের স্বাক্ষর থাকলেও রায়ে সেগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আদালত জানায়, “নথিপত্রের এই অসঙ্গতি খুঁজতেই আদালতের দেড় ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে।”
ট্রাইব্যুনালের নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণের বেহাল দশা দেখে আদালত আসাম সরকারকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছে-
১. রাজ্য সরকার কেন ট্রাইব্যুনালের সদস্য এবং বেঞ্চ সহকারীদের নথিপত্র সঠিকভাবে রাখার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে না?
২. প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরেও যদি সদস্যরা নিয়ম মেনে রেকর্ড বজায় না রাখেন, তবে কেন অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের মতো নির্দিষ্ট বয়সের পর তাঁদের উপযোগিতা পর্যায়ক্রমিক ভিত্তিতে পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে না?
হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০১৮ সালে শিরাজুল হকের বিরুদ্ধে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের রায়টিতে ‘বিবেচনাবোধের অভাব’ ছিল। কারণ, সেখানে রেকর্ডে থাকা প্রমাণগুলি সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের ২০১৮ সালের রায়টি বাতিল করে মামলাটি পুনরায় প্রমাণের পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। আবেদনকারীকে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পুনরায় ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে বলা হয়েছে। রাজ্য সরকারকে সমস্ত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের জন্য একটি নির্দেশিকা বা অ্যাডভাইজারি জারি করতে বলা হয়েছে, যাতে তারা সাক্ষ্য এবং নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে। হাইকোর্টের এই আদেশের কপি রাজ্যের সমস্ত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আসামে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল হলো এমন একটি আধা-বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ, যারা ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি ভারতীয় না বিদেশি, সেই বিষয়ে রায় দেয়। সাধারণত বর্ডার পুলিশ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করলে বা ভোটার তালিকায় কারও নামের পাশে ‘D’ (Doubtful) থাকলে এই ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়।
এখানে ২৫ মার্চ, ১৯৭১ তারিখটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনেই পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করেছিল। আসামের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, এই তারিখের পর ভারতে আসা ব্যক্তিদের বিদেশি হিসেবে শনাক্ত করার বিধান রয়েছে। আদালত আশা প্রকাশ করেছে, এরপর থেকে ট্রাইব্যুনালগুলো মতামত প্রকাশের আগে সমস্ত নথি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করবে, যাতে বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি না থাকে।
