ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মহারাষ্ট্রের পুনে জেলায় এক ভয়াবহ বিষমদ ট্র্যাজেডির ঘটনা সামনে এসেছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় মিথানল মিশ্রিত বিষাক্ত মদ খেয়ে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। পুনে পুলিশ এবং রাজ্য আবগারি দপ্তর ইতিমধ্যেই এই বেআইনি মদের নেটওয়ার্ক বা চক্রটি গুঁড়িয়ে দিতে দেশজুড়ে তদন্ত ও চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ এই মৃত্যুগুলিকে সাধারণ বা সম্পর্কহীন অসুস্থতা বলে মনে করলেও, পরবর্তীতে দেখা যায় সমস্ত মৃতদের ক্ষেত্রেই তীব্র মাথা ঘোরা এবং পেটে অসহ্য যন্ত্রণার মতো উপসর্গ ছিল— যা মদ পানের পর বিষক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। এরপরই ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বিষক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় পুলিশ তদন্তের গতি বাড়ায়। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিষমদের থাবায় পুনে জেলার দুটি শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিম্পরি চিঞ্চওয়াড়ে বিষমদ খেয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুনে শহরে বিষাক্ত মদ পানের পর ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এই মৃত্যুমিছিলের ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ যোগেশ ওয়াংখেড়ে নামের এক ব্যক্তিকে এই চক্রের মূল হোতা বা লিঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পুলিশি তাড়ায় অবশেষে সে কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে যোগেশ স্বীকার করেছে, সে-ই পুনে শহর এবং পিম্পরি চিঞ্চওয়াড় এলাকায় এই কেমিক্যালযুক্ত বিষাক্ত মদ সরবরাহ করেছিল। রাজ্য আবগারি দপ্তরের সুপারিন্টেনডেন্ট অতুল কানাড়ে জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা মদের ঝাঁঝ ও পরিমাণ বাড়াতে অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ‘মিথানল’ মিশিয়েছিল, যার ফলেই এই একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই চক্রে আর কারা জড়িত, তা জানতে যোগেশকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড়ের পুলিশ কমিশনার বিনয় চৌবে জানিয়েছেন, যোগেশ ছাড়া আরও ৫ অভিযুক্ত বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং অন্য দুই অভিযুক্ত আবগারি দপ্তরের হেফাজতে আছে। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তের দায়িত্ব ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
হদপসরের পান্ডারে মালা এলাকার এক শোকগ্রস্ত পরিবারের সদস্য বলেন, “আমাদের এই এলাকা থেকেই ৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জনই আমাদের পরিবারের— অরুণ, রাহুল এবং যশবন্ত। গতকাল মদ খাওয়ার মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ওরা বমি করতে শুরু করে এবং পেটে তীব্র ব্যথার কথা জানায়। হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ারও সময় মেলেনি।” মৃত অরুণ বামন দাদরের মেয়ে জানান, তাঁর বাবা দিন-রাত দেশি মদ খেতেন। গতকালও কাজ থেকে ফিরে মদ খান। আগেও কয়েকবার মাথা ঘোরার সমস্যা হয়েছিল, কিন্তু তা যে এতটা মারাত্মক রূপ নেবে তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দাপোড়ি, ফুগেইওয়াড়ি এবং হদপসর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই দেদার বেআইনি দেশি ও চোলাই মদ বিক্রি হচ্ছিল। পুলিশ এবং আবগারি দপ্তরের আধিকারিকরা সব জেনেও আর্থিক সুবিধা বা অন্য কারণে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তার মাশুল দিতে হলো ১৮টি তাজা প্রাণকে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ পুনে এবং পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড়— উভয় এলাকার পুলিশ কমিশনারদের দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করতে হবে এবং এই অবৈধ মদের র্যাকেটের সাথে যুক্ত একজনও যেন কোনোভাবে শাস্তি থেকে ছাড় না পায়, তা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।
