ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতীয় খাদ্য নিগম বা এফসিআই-এর ২০ হাজার কোটি টাকার আধুনিক শস্যভাণ্ডার বা ‘সাইলো’ নির্মাণ প্রকল্পের সিংহভাগ চুক্তি আদানি গ্রুপ ও আরেকটি বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে সরব হলো দেশের বামপন্থী দল ও কৃষক সংগঠনগুলি। সিপিআই(এমএল) লিবারেশন এবং অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভা (এআইকেএস)-এর অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদি সরকার নিয়ম শিথিল করে টেন্ডার থেকে একচেটিয়া বিরোধী সুরক্ষাকবচ বাদ দিয়ে দিয়েছে। এর ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পরিকাঠামোয় একটি কর্পোরেট দ্বৈত একচেটিয়া রাজত্ব বা ‘ডুওপলি’ তৈরি হয়েছে।
‘নিউজলন্ড্রি’-র (Newslaundry) একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রথম সামনে আসে। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ এবং নীতি আয়োগ চাপ সৃষ্টি করে এফসিআই-এর ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ সাইলো আধুনিকীকরণ প্রকল্পের টেন্ডার থেকে একচেটিয়া-বিরোধী ধারাটি বাদ দিতে বাধ্য করে। এর ফলেই ‘আদানি এগ্রি লজিস্টিকস লিমিটেড’ এবং ‘লিপ ইন্ডিয়া ফুড অ্যান্ড লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড’ এই প্রকল্পের দুই পর্যায় মিলিয়ে মোট ১৩৪টি চুক্তির মধ্যে ১১০টি চুক্তিই নিজেদের পকেটে পুরে নিয়েছে। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই শস্য মজুতকরণ প্রকল্পে যাতে কোনও একক সংস্থা একাধিপত্য তৈরি করতে না পারে, তার জন্য এফসিআই প্রথমে টেন্ডারে কড়া সুরক্ষাকবচ রেখেছিল। কিন্তু ২০২২ সালে নীতি আয়োগ ও অর্থ মন্ত্রকের হস্তক্ষেপে তা তুলে দেওয়া হয়। এফসিআই ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ প্রকল্প ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রকল্প মূল্য প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা। দুই সংস্থার মোট চুক্তি ১১০টি (১৩৪টির মধ্যে)। চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ১৬,৫০০ কোটি টাকা।
বামপন্থী দলটির দাবি, ১৯৬৪ সালের ফুড কর্পোরেশন অ্যাক্টের অধীনে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য দিতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করতে এফসিআই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এই ধরণের ‘পেছন দরজা দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিকাঠামো বেসরকারিকরণ’ দেশের সার্বিক খাদ্য সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই ছিল কৃষি বাণিজ্যে কর্পোরেট একচেটিয়া আধিপত্য রোধ করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা। এখন দেখা যাচ্ছে সেই বাতিল হয়ে যাওয়া কালো কৃষি আইনগুলি পিছনের দরজা দিয়ে ফিরে আসছে। এফসিআই-এর লাগাম এখন কার্যত আদানি গ্রুপের হাতে চলে যাচ্ছে।”
অন্যদিকে, কৃষক সংগঠন অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে অবিলম্বে তিনটি দাবি জানিয়েছে— একচেটিয়া-বিরোধী ধারাটি পুনরায় ফিরিয়ে আনা, সাইলোর মজুত ক্ষমতায় কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া এবং এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কী ভূমিকা ছিল তা খতিয়ে দেখতে একটি ‘যৌথ সংসদীয় কমিটি’ বা জেপিসি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া।
তীব্র বিতর্কের মুখে খাদ্যশস্য মজুতকরণের এই বিশেষ টেন্ডারে কোনও ধরণের কারচুপি বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এফসিআই)। তাদের দাবি, এই সাইলো উন্নয়ন কর্মসূচিটি আসলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেলের অধীনে তৈরি একটি উদীয়মান খাত, যা দেশের খাদ্য লজিস্টিকস পরিকাঠামো আধুনিক করতে অত্যন্ত জরুরি। নিগমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে করা হয়েছিল। আদানি গ্রুপ দ্বিতীয় পর্বের টেন্ডারে একটিও কাজ না পাওয়াই প্রমাণ করে যে কোনও বিশেষ সংস্থাকে সুবিধা দেওয়া বা কোনও রকম পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়নি। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বা নীতি আয়োগের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত আলাদা করে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
