(ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের তীব্র দমনপীড়ন ও নৃশংসতার জেরে এক রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আধা-সামরিক বাহিনী ও পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও ৭০ জন গুরুতর জখম হয়েছেন। এই নজিরবিহীন হিংসাত্মক ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামাবাদের তীব্র সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, বিশ্ব সম্প্রদায় যেন পাকিস্তানের এই মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অপকর্মের জন্য তাদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।
মঙ্গলবার নতুন দিল্লিতে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পাকিস্তানের তীব্র সমালোচনা করেন। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “আমরা পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে চরম পুলিশি বর্বরতার খবর পেয়েছি, যেখানে বেশ কয়েকজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাকিস্তানের এই সমস্ত অপকর্ম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য তাদের উপযুক্ত শাস্তি বা জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।” তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান এই অঞ্চলের আসল পরিস্থিতি ধামাচাপা দিতে এবং নিজেদের ব্যর্থতা থেকে বিশ্ববাসীর নজর ঘোরাতে লাগাতার ভুয়ো খবর ও ভিডিও ছড়াচ্ছে, যা আসলে তাদের মরিয়া প্রচেষ্টারই প্রমাণ।
কেন উত্তপ্ত পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর?
আগামী ২৭ জুলাই পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের ৪৫টি আসনের আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনে কাশ্মীরের বাইরে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রান্তে বসবাসকারী শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান প্রশাসন। সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (JAAC)-র নেতৃত্বাধীন বেসামরিক নাগরিকেরা এই আসন সংরক্ষণের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাঁদের দাবি, যারা কাশ্মীরে থাকেনই না, পাকিস্তানের অন্যান্য মূল ভূখণ্ডে থাকেন, তাঁদের জন্য এই আসন সংরক্ষণ সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এটি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই আজ ৯ জুন সমগ্র অঞ্চল জুড়ে সম্পূর্ণ ধর্মঘট বা স্তব্ধতার ডাক দিয়েছিল সংগঠনটি। এর জেরেই গত শুক্রবার কাশ্মীর প্রশাসন এই সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’-এর আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং বিদেশি পর্যটকদের অবিলম্বে ওই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
পুঞ্চ সেক্টরের কমিশনার সরদার ওয়াহিদ খান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রবিবার রাওয়ালকোটের একটি হাসপাতালের মর্গের বাইরে জেএএসি-র কর্মীরা জড়ো হয়েছিলেন। এর আগে পুলিশের গুলিতে নিহত এক সহকর্মীর মৃতদেহ নিতেই সেখানে ভিড় জমেছিল। প্রশাসনের দাবি, আধা-সামরিক বাহিনী ভিড় হটাতে গেলে আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও পেট্রল বোমা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। দুষ্কৃতীদের গুলিতে ৪ পুলিশ কর্মী ও ১ পথচারী নিহত হন। এর জবাবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে ৬ জন আন্দোলনকারী নিহত হন। পুলিশ প্রধান লিয়াকত মালিক জানিয়েছেন, ঘটনায় ২৩ জন নিরাপত্তা কর্মী সহ মোট ৭০ জন আহত হয়েছেন এবং ৩০ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশের দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আন্দোলনকারী সংগঠন জেএএসি (JAAC)-র শীর্ষ নেতা শওকত নওয়াজ মীর। সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, “রাওয়ালকোটে প্রশাসন আমাদের সাধারণ মানুষের ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছে।” এই নির্মম অত্যাচারের পরেও ৯ জুনের লকডাউন সফল করতে এবং নিজেদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলনকারীরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী এই হিমালয় অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি ফ্ল্যাশপয়েন্ট বা ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে পাকিস্তানের এই অভ্যন্তরীণ দমননীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
