TOP NEWS

‘ইরানের মস্ত বড় রাজনৈতিক জয়, ট্রাম্পের কাছে বন্দি নেতানিয়াহু:’ ইজরায়েলি বিশ্লেষকরা

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ইজরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা করার পর থেকেই ইজরায়েলের রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি আসলে তেহরানের এক বিশাল “রাজনৈতিক বিজয়” এবং এর ফলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কার্যত ইজরায়েলকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে “বন্দি” বানিয়ে ছেড়েছেন।

তুর্কি সংবাদ সংস্থা ‘আনাদোলু’ ইজরায়েলের একাধিক শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, ইজরায়েলি বিশ্লেষকদের প্রধান ক্ষোভের কারণ হলো—এই চুক্তিতে ইজরায়েলের মূল নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বিপজ্জনক ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বা সহযোগী সংগঠনগুলির প্রতি তেহরানের আর্থিক ও সামরিক মদত দেওয়ার বিষয়টি এই চুক্তিতে অমীমাংসিতই থেকে গেছে।

আরও শক্তিশালী ইরানকে স্বীকৃতি দিল আমেরিকা

ইজরায়েলের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘ইজরায়েল হায়োম’-এর প্রখ্যাত কলামিস্ট বেন-ড্রোর ইয়েমিনি এক নিবন্ধে লিখেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকারান্তরে মধ্যপ্রাচ্যে “একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আরও উগ্র ইরানি সরকারকে” আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিল। ইয়েমিনির যুক্তি, এই চুক্তি ইরানকে কোনো বড় ধরণের শর্ত ছাড়াই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বৈধতা দিল, অথচ তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল বা আঞ্চলিক শক্তির রাশ টানা হলো না। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে ইজরায়েলের ওপর ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিপদ বহাল রইল এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এবং ফিলিস্তিনের হামাস—প্রত্যেকেই আগের মতো ইরানি অর্থায়নে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সক্রিয় থাকবে। তিনি ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, “দুই বছরের যুদ্ধ শেষেও হামাসকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করা যায়নি, আর মাত্র ৪০ দিনের বোমাবর্ষণে ইরানকেও দমানো গেল না।” নেতানিয়াহু-ট্রাম্প সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে তিনি বলেন, অনেক ইজরায়েলি এক অভূতপূর্ব কৌশলগত বোঝাপড়ার আশা করেছিলেন, কিন্তু যৌথ বিমান হামলার মতো কিছু সামরিক সহযোগিতা হলেও তা শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছেন নেতানিয়াহু।

সামরিক জয়ের চেয়েও রাজনৈতিক পরাজয় অনেক বড়

অন্যতম প্রধান ইজরায়েলি দৈনিক ‘মাআরিভ’-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেন ক্যাসপিট সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে লিখেছেন, হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে ইজরায়েল বেশ কিছু সামরিক সাফল্য পেলেও, নেতানিয়াহু শেষ পর্যন্ত ইজরায়েলকে এক “মারাত্মক রাজনৈতিক পরাজয়ের” দিকে ঠেলে দিয়েছেন। ক্যাসপিটের কথায়, “আমাদের এই রাজনৈতিক পরাজয় সামরিক বিজয়গুলোর চেয়েও অনেক বড়। নেতানিয়াহু নিজেকে ট্রাম্পের কাছে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়েছেন এবং ইজরায়েলকেও সেই অন্ধকূপের দিকে টেনে নিয়ে গেছেন। ইরান তাদের পরমাণু প্রকল্প বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ—কোনোটিই ত্যাগ করার নিয়ত করেনি। এক বছর আগের তুলনায় বর্তমান ইরানি শাসক দল ইজরায়েলের জন্য এখন বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক।”

সবচেয়ে বড় লাভবান হলো ইরান

‘মাআরিভ’ পত্রিকার অপর এক বিশ্লেষক আভি আশকেনাজি লিখেছেন, ইজরায়েল এই চুক্তির কোনো পক্ষ বা অংশীদার না হওয়া সত্ত্বেও, এর শর্তাবলী পরোক্ষভাবে ইজরায়েলের হাত-পা বেঁধে দিয়েছে। চুক্তিটি নির্ধারণ করে দিচ্ছে যে ইজরায়েল আগামী দিনে কী করতে পারবে আর কী পারবে না। আশকেনাজি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চুক্তির ফলে ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংক থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। এই বিপুল অর্থ হাতে পাওয়ার পর হুথি, হামাস এবং হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলি নতুন করে “লাইফ সাপোর্ট বা সঞ্জীবনী সুধা” পেয়ে যাবে। তিনি বলেন, ইরান এখন আবার পুরোদমে তেল রপ্তানি শুরু করবে। ভারতের মতো আমদানিকারী দেশগুলো সস্তায় তেল পেলেও ইজরায়েলের হিসাব সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। তাঁর কথায়, “ব্যর্থতা এখানে আকাশছোঁয়া, পতন একেবারেই বাস্তব এবং এই খেলায় ইরানই সবচেয়ে বড় বিজয়ী।”

অত্যন্ত খারাপ চুক্তি

ইজরায়েলি সংবাদপত্র ‘হারেতজ’ (Haaretz)-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষক জভি বার’এল তাঁর কলামে কড়া শিরোনাম দিয়েছেন—”ইরান কেবল টিঁকে থাকতেই সন্তুষ্ট নয়, তারা এখন পরাশক্তি হতে চায়”। তিনি সাফ জানিয়েছেন, একটি অত্যন্ত খারাপ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার চেয়ে কোনো চুক্তি না হওয়াই ইজরায়েলের জন্য অনেক ভালো ছিল। বার’এল দাবি করেন, এখন যে নথিটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়, এটি মূলত একটি ‘ওয়ার্কিং পেপার’ বা নীতিগত খসড়া, যার ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনে আলোচনা এগোবে। তিনি প্রকাশ করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও আগে যে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার বিপরীতে গিয়ে এই আলোচনার কোনো স্তরেই ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো কথাই তোলা হবে না। একইভাবে ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে ইরানের নেটওয়ার্ক বা অর্থ সরবরাহ বন্ধের বিষয়টিও আলোচনার টেবিল থেকে সম্পূর্ণ বাদ রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি যেখানে বিশ্ববাজারে স্বস্তি এনেছে, সেখানে ইজরায়েলের অন্দরে তা এক চরম নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে বলেই মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!