ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর স্বপ্ন এখনও পূরণ না হলেও, ব্যবসায়িক দুনিয়ায় এককালে যা সম্পূর্ণ অসম্ভব বলে মনে করা হতো, আজ সেই মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন এলন মাস্ক। নিউ ইয়র্কের নাসদাক শেয়ার বাজারে তাঁর মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা ‘স্পেসএক্স’-এর ব্লকবাস্টার ও রেকর্ডব্রেকিং আইপিও অভিষেকের ওপর ভর করে ইতিহাসের প্রথম ‘ট্রিলিয়নেয়ার’ হিসেবে নিজের নাম নথিভুক্ত করলেন মার্কিন ধনকুবের। স্পেসএক্স আইপিও-র মাধ্যমে বাজার থেকে রেকর্ড ৭৫ বিলিয়ন ডলার তোলার প্রায় সাথে সাথেই এলন মাস্কের মোট ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এটিই এযাবতকালের বৃহত্তম আইপিও, যা ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল জায়ান্ট ‘আরামকো’-র গড়া ৩৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছে।
শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার ঠিক আগে, নিজেদের ট্রেডমার্ক স্টাইলে একটি বিশাল ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটের সফল উৎক্ষেপণ করে স্পেসএক্স। বাজারে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংস্থার শেয়ারের দাম ১৩৫ ডলারের লিস্টিং প্রাইস থেকে ৩০ শতাংশ লাফিয়ে ১৭৬.৫২ ডলারে পৌঁছে যায়। এর ফলে স্পেসএক্সের মোট বাজার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অভাবনীয় সাফল্যের জেরে স্পেসএক্স এখন আমেরিকার ষষ্ঠ মূল্যবান তালিকাভুক্ত সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই তালিকায় তাদের সামনে রয়েছে কেবল এনভিডিয়া, অ্যাপল, অ্যালফাবেট (গুগল), মাইক্রোসফট এবং আমাজন।
এলন মাস্কের এই ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভারতের আনুমানিক ৪.১ ট্রিলিয়ন ডলারের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, আইপিও মূল্যে স্পেসএক্সে মাস্কের নিজস্ব অংশীদারিত্বের মূল্য প্রায় ৬৯০ বিলিয়ন ডলার। গাড়ি নির্মাতা সংস্থা টেসলা থেকে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ২৯০ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা এক্সএআই এবং মগজে চিপ বসানোর প্রযুক্তি সংস্থা নিউরালিঙ্ক-এ তাঁর বড় অঙ্কের মালিকানা রয়েছে। মাস্ক যদি প্রতিদিন ৫ কোটি ডলার করেও খরচ করেন, তাও তাঁর এই সম্পত্তি শেষ হতে বহু দশক লেগে যাবে। তিনি চাইলে আমেরিকার প্রত্যেকটি নাগরিকের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ঋণ একাই ৫ বার শোধ করে দিতে পারেন।
বিশ্বের ধনকুবেরদের তালিকায় মাস্কের ধারেকাছে এখন কেউ নেই। ফোর্বসের রিয়েল-টাইম বিলিয়নেয়ার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা গুগলের ল্যারি পেজের সম্পত্তি ২৯৫.৩ বিলিয়ন ডলার—যা মাস্কের সম্পদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। এদিকে, ফোর্বসের তালিকায় ২২৯ জন বিলিয়নেয়ার নিয়ে বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। ভারতের শীর্ষ ধনকুবেরের লড়াইয়ে মুকেশ আম্বানিকে সামান্য ব্যবধানে টেক্কা দিয়ে পুনরায় দেশের ধনী ব্যক্তি হয়েছেন গৌতম আদানি (৮৯.২ বিলিয়ন ডলার)।
স্পেসএক্সের এই আকাশছোঁয়া মূল্যায়ন নিয়ে ওয়াল স্ট্রিটের অনেক বাজার বিশ্লেষক অবশ্য সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, এই মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ২০১৫ সালে ১৮.৭ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করলেও, স্পেসএক্সের ঘাড়ে এখনো ৪.৯৫ বিলিয়ন ডলারের বিপুল ঋণ রয়েছে। যদিও বিশ্বজুড়ে ১ কোটি ২৭ লক্ষ গ্রাহককে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা দেওয়া তাদের ‘স্টারলিংক’ প্রজেক্টটি দারুণ লাভজনক ব্যবসা করছে।
অর্থের পাহাড় গড়লেও মাস্কের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন গত ১৮ মাসে চরম ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে সরকারি খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’-তে যোগ দিলেও, ট্রাম্পের সাথে প্রকাশ্য বিবাদের জেরে তিনি পদত্যাগ করেন। চীনের বাজারে টেসলা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে এবং আমেরিকার গ্রাহকদের একাংশ মাস্কের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে টেসলা গাড়ি বয়কট করছে। সম্প্রতি উত্তর আয়ারল্যান্ডে বর্ণবিদ্বেষী দাঙ্গার উস্কানি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘X’-কে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এত সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও মাস্কের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই। ১৪টি সন্তানের বাবা মাস্ক মনে করেন, বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমে যাওয়া মানব সভ্যতার জন্য অন্যতম বড় ঝুঁকি। সম্প্রতি ভারতের হায়দরাবাদে টেসলার একটি শোরুম খুললেও, নয়াদিল্লির কাছ থেকে নীতিগত ছাড় বা শুল্ক সুবিধা না পাওয়ায় ভারতের প্রতি মাস্কের উৎসাহ আগের চেয়ে অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে।
