TOP NEWS

অস্তিত্ব সংকটে জাপানের রাজপরিবার: পুরুষ উত্তরাধিকারী দত্তক নেওয়ার প্রস্তাব আইনসভায়

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন রাজতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান জাপানের রাজপরিবার বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। যোগ্য সদস্যের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ সম্রাটের অভাব রাজপরিবারের ধারাবাহিকতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশটির আইনসভায় (ডায়েট) রাজপরিবারের মর্যাদা পুনরুজ্জীবিত করতে একটি নজিরবিহীন ও নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নতুন প্রস্তাবে জাপানি রাজপরিবারকে দূর সম্পর্কের কোনো পুরুষ আত্মীয়কে দত্তক নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে জাপানের রাজপরিবারে সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৬ জন, যার মধ্যে পুরুষ মাত্র ৫ জন এবং মহিলা ১১ জন। সদস্য সংখ্যা এতটা কমে যাওয়ার কারণে রাজপরিবারের পক্ষে তাঁদের প্রথাগত জনসাধারণের দায়িত্ব, যেমন—বিদেশ সফর বা আদালতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় এই কর্মসূচীগুলো সামলানোর মতো পর্যাপ্ত রাজপরিবারের সদস্য বর্তমানে উপলব্ধ নেই। সেই কারণেই এই নিয়মে বদল এনে রাজকীয় পদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সম্রাট নির্বাচনের বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে টোকিও। জাপানের ১৯৪৭ সালের ‘ইম্পেরিয়াল হাউসহোল্ড ল’ অনুযায়ী, কেবলমাত্র পুরুষ বংশধরেরাই জাপানের সিংহাসনে আরোহণ করতে পারেন। বর্তমান জাপানি সম্রাট নারুহিতো (Emperor Naruhito)-র কোনো পুত্রসন্তান নেই, তাঁর একমাত্র সন্তান হলেন রাজকুমারী আইকো (Princess Aiko)। বর্তমানে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে লাইনে রয়েছেন মাত্র তিনজন- সম্রাটের ছোট ভাই তথা ক্রাউন প্রিন্স আকিষিনো (৬০), আকিষিনোর পুত্র প্রিন্স হিসাহিতো (১৯) ও প্রিন্স হিতাচি (৯০)

যেহেতু ১৯ বছর বয়সী প্রিন্স হিসাহিতো এই রাজপরিবারের একমাত্র তরুণ পুরুষ সদস্য, তাই সমগ্র জাপানি রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন কার্যত তাঁর একার ওপর নির্ভর করছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নারী সদস্যরা সিংহাসনের দাবিদার হতে পারেন না, উল্টে কোনো সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলে তাঁদের রাজকীয় মর্যাদা ও উপাধিও হারাতে হয়। রাজকুমারী আইকোর ক্ষেত্রেও বর্তমানে এই একই নিয়ম প্রযোজ্য। সরকারের এই দূর সম্পর্কের পুরুষ আত্মীয়কে দত্তক নেওয়ার পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন জাপানের বহু শীর্ষ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অধিকার কর্মীরা। তাঁদের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে সহজ ও আধুনিক সমাধান হলো মহিলাদের সিংহাসনে বসার অনুমতি দেওয়া। বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও দেখা গেছে, জাপানের সাধারণ মানুষ একজন মহিলা সম্রাটকে মেনে নেওয়ার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন জানিয়েছেন।

জাপানের ইতিহাসে নারীদের সিংহাসনে বসার নজির কিন্তু রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সম্রাজ্ঞী গো-সাকুরামচির মতো মহিলা শাসকেরা দক্ষতার সাথে জাপান শাসন করেছিলেন। তবে আধুনিক যুগে এসে কেবল পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের নিয়মই বহাল রাখা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, যা গত সাত দশক ধরে জাপানের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি, তারা পুরুষের এই উত্তরাধিকার ধারাকে ‘অলঙ্ঘনীয়’ বলে মনে করে।

বর্তমানে আইনসভায় যে বিলটি বিবেচনা করা হচ্ছে, তাতে কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারী দত্তক নেওয়ার কথাই বলা হয়নি, বরং নারী সদস্যদের জন্য কিছুটা স্বস্তির প্রস্তাবও রয়েছে। নতুন নিয়ম পাস হলে, রাজপরিবারের নারী সদস্যরা সাধারণ পরিবারে বিয়ে করার পরেও তাঁদের রাজকীয় উপাধি বজায় রাখতে পারবেন এবং রাজপরিবারের অংশ হিসেবেই থেকে যেতে পারবেন। তবে সমালোচকদের একাংশের দাবি, লিঙ্গ সমতার খাতিরে রাজকুমারী আইকোকে সরাসরি পরবর্তী সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষণা করা হোক। সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজকুমারী আইকোর বিপুল জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা এই দাবিকে আরও জোরালো করে তুলেছে। জাপানের ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ধারণ করবে আইনসভার এই নতুন বিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!