ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: “একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন আসলে কেবল শারীরিক অপরাধ নয়, এটি শিশুর মর্যাদা এবং তার আত্মার ওপর চরম আঘাত। এই ধরণের অপরাধে বেঁচে থাকাটাই এক যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘ লড়াইয়ে পরিণত হয়। তাই শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া এই অপরাধ খুনের চেয়েও অনেক বেশি জঘন্য এবং এটি মৃত্যুদণ্ডের মতোই কঠিনতম সাজার যোগ্য।”— একটি পকসো (POCSO) মামলার রায়ে এমনই অত্যন্ত কঠোর পর্যবেক্ষণ জানাল মাদ্রাজ হাইকোর্ট।
৬ থেকে ৮ বছর বয়সী তিনটি নাবালিকা শিশুকে দীর্ঘদিন ধরে লাগাতার যৌন নির্যাতনের দায়ে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে উচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ। এর আগে একটি বিশেষ পকসো আদালত ওই অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা শুনিয়েছিল। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দোষী ব্যক্তি হাইকোর্টে আপিল জানালে আদালত তার আবেদন সম্পূর্ণ খারিজ করে দেয়।
মামলার বিচার চলাকালীন ডিফেন্স বা আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দিয়েছিলেন যে—ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শিশুদের দেওয়া জবানবন্দি এবং পরবর্তীতে ট্রায়াল কোর্টে দেওয়া জবানবন্দির মধ্যে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। এই যুক্তি খারিজ করে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, শিশুদের সাক্ষ্য মূল্যায়নের সময় আদালতকে ছোটখাটো অসঙ্গতি বাদ দিয়ে মূল অভিযোগের দিকে ফোকাস করতে হবে। আদালতের ভাষায়, “সত্যের মধ্য থেকে খড়কুটো আলাদা করার দায়িত্ব আদালতের।” আদালত পর্যবেক্ষণ করে, সময়ের ব্যবধানে শিশুদের বয়ানে সামান্য কিছু অমিল থাকলেও, তিন সারভাইভার বা বেঁচে ফেরা শিশুর মূল বক্তব্য অত্যন্ত সুসংগত, স্বাভাবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে প্রতি শনিবার ওই তিনটি শিশুকে একটি ফাঁকা বাড়িতে প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়ে যেত। সেখানে ছুরি দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হতো। ভয়ে শিশুরা বাড়িতে কিছু বলতে পারেনি। একদিন এক শিশুর মা তার মেয়েকে অন্য একটি শিশুর সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে শোনেন। তখনই এই ভয়ানক সত্য সামনে আসে এবং পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগ দায়ের করতে দেরি হওয়া নিয়ে আসামিপক্ষের তোলা প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে হাইকোর্ট জানায়, “যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে তা যদি কোনো শিশুর সাথে ঘটে থাকে, তবে এফআইআর বা অভিযোগ দায়ের করতে দেরি হওয়াকে কখনোই অপরাধীর ডিফেন্স বা আত্মপক্ষ সমর্থনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সামাজিক কলঙ্ক, লোকলজ্জার ভয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার ট্রমার কারণে পরিবারগুলি প্রায়শই অভিযোগ জানাতে দ্বিধাবোধ করে।”
আদালত আরও ব্যাখ্যা করেছে, নির্যাতিত শিশুদের দেওয়া তথ্য ও প্রমাণাদি মামলার প্রাথমিক সত্যতা সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। এর ফলে পকসো আইনের ২৯ এবং ৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী ‘রিভার্স বার্ডেন’ সক্রিয় হয়ে যায়। এই নিয়ম অনুযায়ী, অভিযুক্ত যে নির্দোষ—তা প্রমাণ করার আইনি দায়ভার সম্পূর্ণ তার নিজের ওপর বর্তায়। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আদালত অত্যন্ত আবেগঘন ও কড়া ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছে, খুনের মামলায় মানুষের জীবন চলে যায়, কিন্তু এই ধরণের যৌন অপরাধে “জীবন বেঁচে থাকলেও মানুষের আত্মাটি চিরতরে হারিয়ে যায়।” তাই অপরাধীর জন্য কোনো সহানুভূতি না দেখিয়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির সাজাই বহাল রেখেছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট।
