ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিল উত্তরাখণ্ড। দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে তারা নিজেদের বিধিবদ্ধ ‘মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড’ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। তার পরিবর্তে রাজ্যে চালু করা হয়েছে ‘মাইনরিটি এডুকেশন অথরিটি’ বা ‘সংখ্যালঘু শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’। এর ফলে এখন থেকে মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি, জৈন এবং বৌদ্ধ—এই ছয়টি বিজ্ঞাপিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একই ছাতার তলায় চলে আসবে এবং একই নিয়মকানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। বুধবার ‘মাইনরিটি এডুকেশন অ্যাক্ট, ২০২৫’-এর অধীনে গঠিত এই ‘উত্তরাখণ্ড স্টেট অথরিটি ফর মাইনরিটি এডুকেশন’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি।
এর আগে উত্তরাখণ্ডের মাদ্রাসাগুলি ‘মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ড অ্যাক্ট, ২০১৬’ এবং ‘উত্তরাখণ্ড নন-গভর্নমেন্ট অ্যারাবিক অ্যান্ড পার্সিয়ান মাদ্রাসা রিকগনিশন রুলস, ২০১৯’ দ্বারা পরিচালিত হতো। বুধবার থেকে এই পুরনো আইন ও নিয়মাবলী সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে গেছে। এর জায়গায় বলবৎ হয়েছে ‘মাইনরিটি এডুকেশন অ্যাক্ট, ২০২৫’ এবং ‘উত্তরাখণ্ড মাইনরিটি এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস রিকগনিশন রুলস, ২০২৬’। বর্তমানে রাজ্যে ৪৫২টি নিবন্ধিত মাদ্রাসা রয়েছে, যা আগে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ছিল। উল্লেখ্য, সরকারি স্বীকৃতি না থাকা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে গত বছর রাজ্যজুড়ে মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালিয়েছিল ধামি সরকার। সেই সময় ২০০-রও বেশি মাদ্রাসা সিল করে দেওয়া হয়। এর পরেই গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয় এবং গত ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বিধানসভায় এই নতুন আইনটি পাস হয়।
নতুন এই ব্যবস্থার সূচনা করে বুধবার মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির হাতে সরকারি স্বীকৃতির শংসাপত্র তুলে দেন। একই সাথে সংখ্যালঘু স্কুলের পড়ুয়াদের হাতে জাতীয় স্তরের ‘এনসিইআরটি’ পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এটি স্রেফ আরেকটি নতুন সরকারি দফতর তৈরি করা নয়, বরং রাজ্যের প্রতিটি শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শক্ত ভিত গড়ার সিদ্ধান্ত। তাঁর সরকার প্রতিটি শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়, যাতে তারা আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি বলেন, “এই সংখ্যালঘু শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্দেশ্য কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্য বা ধর্মীয় পরিচয়ে আঘাত করা নয়, বরং সমাজের সব অংশকে আরও ভালো শিক্ষার সুযোগ দেওয়া। আমাদের লক্ষ্য হলো, শিশুরা যেন তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শিকড়ের সাথে যুক্ত থেকেও বিজ্ঞান, গণিত, কম্পিউটার এবং আধুনিক শিক্ষায় পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে।”
সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক পাঠ্যক্রম তৈরি করতে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে এই কর্তৃপক্ষ। এই দলে রয়েছেন কুমাওন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান ও আইনের অধ্যাপক এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজি শিক্ষক। এছাড়াও কমিটিতে স্থান পেয়েছেন দুজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী, উচ্চশিক্ষা দপ্তরের ডিরেক্টর, রাজ্য শিক্ষামূলক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের ডিরেক্টর এবং সংখ্যালঘু কল্যাণ দপ্তরের ডিরেক্টর।
সংখ্যালঘু কল্যাণ দপ্তরের সচিব পরাগ মধুকর ধাকাতে জানিয়েছেন, নতুন পরিকাঠামোয় মাদ্রাসা বা যেকোনো সংখ্যালঘু স্কুল চালাতে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাধ্যতামূলকভাবে দুটি স্তর পার করতে হবে। প্রথমটি উত্তরাখণ্ড শিক্ষা বোর্ড (Uttarakhand Board of Education) থেকে আনুষ্ঠানিক এফিলিয়েশন বা অনুমোদন নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন নিয়ম অনুযায়ী USAME থেকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি নিতে হবে।
পুরো আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইন করে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং ফি জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে। প্রতিটি স্বীকৃতির মেয়াদ থাকবে ৩টি শিক্ষাবর্ষের জন্য। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৩ মাস আগে রিনিউয়াল বা নবীকরণের আবেদন করতে হবে। দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু চরিত্র, জমির মালিকানা, আর্থিক স্থিতি, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং এলাকায় সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা খতিয়ে দেখেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হবে। প্রয়োজনে স্থাবর জমিতে গিয়ে ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন বা বাস্তব পরিদর্শনও করা হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম লঙ্ঘন করলে তাদের স্বীকৃতি বাতিল করারও বিধান রাখা হয়েছে, তবে তার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নিজেদের বক্তব্য পেশ করার সম্পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে।
