TOP NEWS

‘ইতিহাসের সফলতম হজ’ দাবির আড়ালে চরম অব্যবস্থা! বিমানভাড়া বৃদ্ধি থেকে লাগেজ চুরি—প্রশ্নের মুখে কেন্দ্র

ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: চলতি বচরের হজ যাত্রাকে ভারতের ইতিহাসের “সবচেয়ে সফল” বলে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এই স্বস্তির দাবির আড়ালেই এবার উঠে আসছে লাগেজ চুরি, ভাঙা সুটকেস, দেরিতে ব্যাগ ডেলিভারি এবং শেষ মুহূর্তে বিমানভাড়া আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়ার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ। ফলে সরকারের এই ‘স্বয়ং-অভিনন্দন’ বা সাফল্যের খতিয়ানকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তীর্থযাত্রী ও মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, বাস্তব স্তরের বড় বড় খামতি ও অব্যবস্থাকে আড়াল করতেই একটি সাজানো সাফল্যের গল্প প্রচার করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রকের ডাকা এক পর্যালোচনা বৈঠকে সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ২০২৬ সালের হজ ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে ‘হজ ২০২৭’-এর প্রস্তুতি রূপরেখা প্রকাশ করেন। কিন্তু এই বৈঠকের নেপথ্যেই রয়ে গেছে একাধিক প্রশ্ন। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের হজ যাত্রার তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য যে বিধিবদ্ধ সংস্থা দায়ী, সেই ‘সেন্ট্রাল হজ কমিটি’ ছাড়াই এবারের পুরো অপারেশনটি পরিচালিত হয়েছে। আগের কমিটির মেয়াদ গত ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শেষ হয়ে গেছে এবং তারপর থেকে সরকার কোনো নতুন কমিটি গঠন করেনি। প্রশ্ন উঠছে, যে প্রতিষ্ঠানটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মূল স্তম্ভ, সেটি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা সত্ত্বেও সরকার কীভাবে একে ‘নজিরবিহীন সফল’ বলে দাবি করতে পারে?

জানা যায়, যাত্রার ঠিক প্রাক্কালে হঠাৎ করেই হজের বিমানভাড়া প্রায় ১০,০০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। বহু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে টাকা জমিয়ে হজে যান। তাঁদের জন্য এই শেষ মুহূর্তের ভাড়া বৃদ্ধি ছিল একটি বড় আর্থিক ধাক্কা। সরকারের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে অপারেটিং খরচ বৃদ্ধির অজুহাত দেওয়া হলেও তা ধোপে টেকেনি। কারণ, ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের একটা বড় অংশকে পরিবহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সৌদি এয়ারলাইন্সকে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশের বিমান সংস্থা। এই ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সদুত্তর মন্ত্রকের পর্যালোচনা বৈঠকে মেলেনি।

সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের লাগেজের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের ইতিহাসে সম্ভবত এবারই প্রথম এত বড় কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। ফিরে আসা বহু তীর্থযাত্রী দেখেন তাঁদের সুটকেসের লক ভাঙা এবং ভেতর থেকে সোনা-রুপোর গয়না, আতর, দামী পোশাক ও বাচ্চাদের খেলনা চুরি গেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও এই চুরির ঘটনায় তীব্র বিক্ষোভ দেখান যাত্রীরা। বিমানবন্দরের আধিকারিকদের এই নিয়ে উদাসীনতারও অভিযোগ উঠেছে। এখানে আবার যাত্রীরা বাড়ি পৌঁছানোর ৪-৫ দিন পর তাঁদের লাগেজ হাতে পান। অভিযোগ, বিমানবন্দর চত্বরের বাইরে খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল প্রবীণ তীর্থযাত্রীদের মালামাল। যদিও বিতর্কের মুখে পড়ে মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিরোধীদের দাবি—তদন্তের প্রয়োজন হওয়াটাই প্রমাণ করে যে হজ ব্যবস্থাপনা ‘ত্রুটিহীন’ ছিল না।

সংখ্যালঘু মন্ত্রী রিজিজু দাবি করেছেন, ২০২৬ সালের হজে ৯০ জনেরও কম ভারতীয় তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক কম। একেই উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। তবে অভিজ্ঞ মহল এই পরিসংখ্যান নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে। কারণ, মন্ত্রী তাঁর তুলনামূলক খতিয়ানে ঠিক আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের তথ্য এড়িয়ে গেছেন, যেখানে মাত্র ৬২ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। এমনকি ২০২২ সালের হজে মাত্র ২১ জন ভারতীয় মারা যান। ফলে নিজেদের সফল দেখাতে সরকার বেছে বেছে কেবল ২০২৪ সালের খারাপ পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা টেনেছে বলে অভিযোগ।

ভারতে হজের কোটা কেন বাড়ছে না, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মন্ত্রী। সৌদি আরব মূলত মুসলিম জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে কোটা বরাদ্দ করে। কিন্তু ভারতে সর্বশেষ আদমশুমারি হয়েছিল ২০১১ সালে। নতুন জনশুমারি বারবার পিছিয়ে যাওয়ার কারণে ভারতের কাছে হালনাগাদ কোনো সরকারি তথ্য নেই। রিজিজু আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭ সালের সেন্সাস বা জনশুমারি শেষ হলে দেখা যাবে ভারতের মুসলিম জনসংখ্যা পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াকেও ছাড়িয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে হজের কোটা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতের দাবিকে মজবুত করবে। খুব শীঘ্রই নতুন হজ নীতি ঘোষণা করা হবে বলেও তিনি জানান।

ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা বা মক্কা-মদিনার মধ্যে হাই-স্পিড ট্রেনের মতো কিছু প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং সৌদি সরকারের তরফ থেকে ভারতের দুটি পুরস্কার পাওয়া নিশ্চয়ই ইতিবাচক দিক। তবে প্রবীণ হজ পর্যবেক্ষকদের মতে—পুরস্কার বা প্রযুক্তি কখনোই প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এড়ানোর বিকল্প হতে পারে না। হজের মতো একটি পবিত্র বিষয় নিয়ে সরকারের এই পর্যালোচনা বৈঠক আত্মদর্শনের চেয়ে ‘নিজেদের পিঠ চাপড়ানোর’ উৎসবে বেশি পরিণত হয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!