ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেই সামরিক শক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এল। সোমবার (৮ জুন) সুইডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (SIPRI)-এর প্রকাশ করা বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সামরিক ব্যয়ের (Military Expenditure) নিরিখে ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একই সাথে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ভারতের কাছে আনুমানিক ১৯০টি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বা ওয়ারহেড রয়েছে, যা প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের তুলনায় ২০টি বেশি। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর চলতি বছর সিপ্রি (SIPRI) তাদের ৬০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। এই বিশেষ সংস্করণে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে দেশগুলি এখন আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কূটনীতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছে, যা গত কয়েক দশকের পরমাণু অস্ত্র কমানোর বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটাচ্ছে।
২০২৫ সালে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয় ১১ বছরের মতো লাগাতার বৃদ্ধি পেয়ে ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা বিশ্বের মোট জিডিপি (GDP)-র ২.৫ শতাংশ। এটি সিপ্রি-র ইতিহাসে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয়। বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি দেশই মোট ব্যয়ের ৮০ শতাংশ (২,৩০৪ বিলিয়ন ডলার) খরচ করেছে, যাদের বড় অংশই ২০২৫ সালে গাজা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল।
পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণ ও চীন-পাকিস্তান ফ্যাক্টর
সিপ্রি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারত তার পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার “সামান্য প্রসারিত” করেছে এবং নতুন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্র বা ডেলিভারি সিস্টেমের উন্নয়ন জারি রেখেছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের বর্তমান সামরিক আধুনিকীকরণ কর্মসূচি মূলত দূরপাল্লার অস্ত্রের ওপর জোর দিচ্ছে, যা সমগ্র চীনের যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম। চীনের পাশাপাশি ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানও নতুন ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি এবং ফিসাইল মেটেরিয়াল মজুত করা জারি রেখেছে, যা ইঙ্গিত করে আগামী এক দশকে পাকিস্তানের পরমাণু ভাণ্ডারও বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০২৬ সালের শুরুতে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা আনুমানিক ১৭০টি।
রিপোর্টে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র সামরিক সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সিপ্রি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ৭ থেকে ১০ মে-র মধ্যে দুই দেশের মধ্যে প্রচণ্ড আন্তঃসীমান্ত গুলিবর্ষণ হয়েছিল। সেই সংক্ষিপ্ত সশস্ত্র সংঘর্ষের সময় ভারত পাকিস্তানের এমন কিছু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়েছিল, যেগুলির পারমাণবিক ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা ছিল। তবে উভয় পক্ষই পরিস্থিতিকে আর বেশি দূর বাড়তে না দেওয়ার জন্য সংযত পদক্ষেপ নিয়েছিল। এছাড়াও, এই প্রথমবার ভারত ও পাকিস্তান কোনো সশস্ত্র সংঘাতের সময় সরাসরি এবং প্রকাশ্যে ‘সাইবার অপারেশন’ বা ডিজিটাল যুদ্ধকৌশলকে যুক্ত করেছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে বিশ্বের মাত্র ৯টি দেশের (আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এবং ইসরায়েল) কাছে সম্মিলিতভাবে আনুমানিক ১২,১৮৭টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে ৯,৭৪৫টি অস্ত্র সামরিক ভাণ্ডারে সরাসরি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রের মোট সংখ্যা কমছে, তবে তা কেবল আমেরিকা ও রাশিয়ার পুরনো বা বাতিল যুদ্ধাস্ত্র ধ্বংস করার কারণে। বাকি দেশগুলি কিন্তু পরমাণু অস্ত্র বাড়িয়েই চলেছে। ২০২১-২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি অস্ত্র আমদানিকারক দেশের তালিকাতেও রয়েছে ইউক্রেন, ভারত, সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তান। এই পাঁচ দেশ মিলেই বিশ্বের মোট অস্ত্র আমদানির ৩৫ শতাংশ সম্পন্ন করেছে। সিপ্রি-র মতে, গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত মেটানোর উদারপন্থী ধারা থেকে সরে এসে দেশগুলি এখন অনেক বেশি ‘ক্ষমতা-ভিত্তিক’ ও ‘লেনদেনমূলক’ বাস্তববাদী নীতির দিকে ঝুঁকছে।
