
——————————————————————————-
আব্দুর রউফ
বেলডাঙ্গা-মুর্শিদাবাদ
১ম পর্ব । আকবর শাহ:
বিশ্ব-যুদ্ধের আঁচে তখন পৃথিবী। সুভাষচন্দ্র এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দী অসুস্থ। সুস্থ হলে ব্রিটিশ সরকার আবার জেলে পুরবে। ভাইপো শিশির বসুর সঙ্গে পরামর্শ করলেন যে করেই হোক তাকে দেশের বাইরে যেতে হবে। ইংরেজ দের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশমাতৃকাকে, স্বাধীন করতে হবে। অন্যদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিশির বসুকে বললেন তুমি পেশোয়ার চলে যাও ওখানে গিয়ে তুমি আকবর শাহের সঙ্গে দেখা করে আমার এখানে নিয়ে এস। নেতাজীর ডাকে আকবর শাহ পেশোয়ার থেকে কলকাতা এলেন। ভাইপো শিশির কুমার বসু তখন বয়সে তরুণ-হিন্দু কলেজের ছাত্র৷ একটু চাপা স্বভাবের কথা খুব কম বলতেন। তাকে যতটুকু নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল- মন্ত্রগুপ্তি শপথে সেটাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন ৷কিন্তু পুরো পরিকল্পনা নেতাজী পরিবারের শরৎ বসু ও কয়েকজন ও বাইরের মধ্যে সত্যরঞ্জন বকসি ছাড়া কেউ জানতেন না। নেতাজী সুভাষচন্দ্র – শিশির বসু ও আকবর শাহ ছদ্মবেশে ব্রিটিশ পুলিশকে চোখে ধুলো দিয়ে বাড়ী থেকে বেরোনোর পরিকল্পনা করলেন। শিশির বসুর সঙ্গে আকবর শাহ ছদ্মবেশের প্রয়োজনীয় কাপড় কেনার পর আকবর শাহ পেশোয়ার ফিরে গেলেন। নির্দিষ্ট দিনে নেতাজী বাড়ী থেকে বেরিয়ে শিশির বসুর তত্বাবধানে গোপনে আরেক ভাইপো-আশোক নাথ বসুর কাছে ছদ্মবেশে বারানি (বারাউনি) গেলেন। তিনি তখন সেখানে কর্মরত ছিলেন। কাছাকাছি আসানসোল কিংবা ধানবাদ থেকে ট্রেন ধরার বিষয়টি আশোকনাথ বসুর ঠিক মনঃপুত হল না। কারণ বড় ষ্টেশনে পুলিশের নজরদারি বেশী হওয়ার কথা। ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ঠিক হল অখ্যাত ষ্টেশন-গোমো থেকেই কালকা মেল ধরার ৷ কিন্তু সমস্যা হল শিশির বসু ওই রাস্তাটা চেনেন না।
শেষ প্রর্যন্ত পথ দেখানোর জন্য আশোক নাথ বসু ও তার স্ত্রী- মীরা বসু নেতাজীর সঙ্গী হলেন। অনেক ভেবেচিন্তেই মীরা বসু কে সঙ্গে নেওয়া হল৷ অখ্যাত এই গোমো ষ্টেশন থেকেই নেতাজী কালকা মেল ধরে পেশোয়ার তারপর আকবর শাহের সঙ্গে কাবুল হয়ে রাশিয়া। বিপদসঙ্কুল পথে আকবর শাহ নিখুঁত ভাবে অভিনয় করে তার প্রিয় নেতাকে রাশিয়া পৌছে দিয়েছিলেন। চল্লিশ বছর পর ইংল্যান্ডে শিশির বসু ও আকবর শাহের দেখা হল। আকবর শাহ পথের সেই রোমহর্ষক ঘটনা নেতাজী রিসার্চ ব্যুরোর কাছে লিপিবদ্ধ করালেন।
২য় পর্ব। আবিদ হাসান:
সুভাষ চন্দ্র এলগিন রোডের বাড়ী থেকে গোপনে বেরিয়ে আফগানিস্থান হয়ে রাশিয়া এসে ওখানকার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করলেন। রাশিয়া নিজেই তখন বিশ্বযুদ্ধের কারণে সঙ্কটময় পরিস্হিতিতে। সুভাষ চন্দ্র বুঝলেন এখান থেকে খুব বেশি কিছু আশা করা যাবেনা। তিনি সেখান থেকে জার্মান এলেন। হিটলার সহ জার্মান নেতৃবৃন্দ সুভাষ চন্দ্র কে বললেন – এশিয়াতে আমাদের মিত্রশক্তি জাপান। আমরা জাপানের প্রধানমন্ত্রি তেজোর সঙ্গে কথা বলেছি। আপনি ওখানে যান। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে যে সব ভারতীয় সৈনিক জাপানের হাতে বন্দী হয়েছে তাদের নিয়ে একটা সেনাবাহিনী গঠন করে ব্রিটিশ এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে। জাপান এ ব্যাপারে রসদ অস্ত্রসহ সমস্থ রকম সহযোগিতা আপনাকে করবে। বিপদসঙ্কুল পথ তাই জার্মান সরকার সুভাষ চন্দ্র কে সমুদ্র পথে জাপান আসার জন্য সাবমেরিনের ব্যবস্থা করলেন। জার্মান থেকে জাপান আসতে ৯০ দিন সময় লেগেছিল। এই সফরে তার সঙ্গী ছিলেন আবিদ হাসান। সুভাষ চন্দ্র এই সময়টা আবিদ হাসানের সঙ্গে পরিকল্পনা করতেন। আবিদ হাসান কে নোট করতে বলতেন। জাপান সরকার নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের হাতে ভারতীয় যুদ্ধবন্দী সৈন্যদের তুলে দিলেন। সুভাষ চন্দ্র তাদের বললেন-তোমরা আজাদ। তোমরা আজাদ হিন্দ ফৌজ। আজাদ হিন্দ ফৌজ শপথ নিল – বিশ্বাস – একতা – বলিদান এর। সুভাষ চন্দ্র আবিদ হাসানকে বললেন – পরস্পরে দেখা হলে সম্বোধন করতে হবে এমন একটা , সুন্দর শব্দ খোঁজ তো। আবিদ হাসান অনেক ভেবে বার করলেন জয়হিন্দ। নেতাজী খুশি হলেন। জয় হিন্দ ইতিহাসে পরিণত হল।
৩য় পর্ব:
বিশ্বাস – একতা – বলিদান -এর আদর্শ বুকে নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতবর্ষের মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রসর হতে শুরু করল। রাসবিহারী বসুর স্বপ্ন যেন সফল হল। সৈন্যদের ব্যারাকে ব্যারাকে সুভাষ চন্দ্রের উদাত্ত আহ্বানে যেন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় নতুন প্রাণের সঞ্চার। প্রতিটি জায়গায় ছায়া সঙ্গী- হবিবুর রহমান। প্রতিটি রেজিমেন্টের জন্য যোগ্য সেনানায়ক বেছে নেওয়া হল। কোন বাহিনী কোন জায়গা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করবে তার নকশা তৈরি হল। মহিলা বাহিনীর দায়িত্বে থাকলেন – লক্ষ্মী সায়গল। সেই সময় মহিলাদের উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করার ভাবনা আজও আমাদের অবাক করে।
দিল্লী চল। লালকিলে সে আয়ি আওয়াজ সায়গল – ধিলোঁ- শাহনওয়াজ। একজন হিন্দু-একজন শিখ – আরেকজন মুসলমান। সৌকত মালিক ভারতে প্রবেশ করে ইম্ফলের কাছে ময়রাং এ জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। জমান কিয়ানী মণিপুরে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত এলাকা অনেক দিন ধরে রেখে দিয়েছিলেন। পরে তার লেখা বই ভারতে প্রকাশিত হয়। নেতাজীর নির্দেশে সিঙ্গাপুরে আই.এন.এর স্মৃতিসৌধ গড়েছিলেন তার নাম সিরিল জন স্ট্রেসি। ধর্মে খ্রিস্টান। যখন আমরা সুভাষ চন্দ্র কে স্মরণ করি তার সঙ্গীদের কথা যেন না ভুলি। তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পরিশেষে নেতাজী পারিবারের প্রয়াত- কৃষ্ণা বসুর কথা দিয়ে শেষ করি। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের এই বীর সহযোদ্ধাদের কথা আমরা ভুলে যেতে পারি? তাদের আত্মত্যাগের মূল্যে এই উপমহাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। আজকের এই অস্থির সময়ে তাদের – একতা – বিশ্বাস – বলিদান এর কথা স্মরণ করি।
(সংগৃহীত)
