নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি, সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর স্বীকৃতি ও বকেয়া ভাতা পরিশোধসহ একাধিক দাবিতে আশাকর্মীদের স্বাস্থ্য ভবন অভিযান ঘিরে ধুন্ধুমার পরিস্থিতি তৈরি হয়। গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) কলকাতায় স্বাস্থ্য ভবন অভিযানে যোগ দিতে যাওয়া আশাকর্মীদের আটকে দিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশি বাধার ছবি সামনে আসে। অভিযোগ, বহু জায়গায় আশাকর্মীদের পুলিশি হেনস্থা ও শারীরিক নিগ্রহ করা হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার রাস্তায় নামলেন আশাকর্মীরা। এদিন পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়নের ডোমকল শাখার সদস্যরা প্রতিবাদ মিছিল করেন। ডোমকল হাসপাতাল চত্বর থেকে শুরু হয়ে বিডিও মোড় হয়ে এসডিও অফিস চত্বরে গিয়ে শেষ হয় আশাকর্মীদের মিছিল। মিছিল চলাকালীন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ডোমকলের রাজপথ। মিছিল শেষে আশাকর্মীরা ন্যূনতম মাসিক সম্মানিক বৃদ্ধি, বীমা সুরক্ষা-সহ তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি দ্রুত পূরণের আহ্বান জানান। দাবি মানা না হলে আগামী দিনেও আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মবিরতি ও আন্দোলন থেকে তাঁরা এক চুলও সরবেন না।
আশাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে টানা ৩০ দিন ধরে কর্মবিরতি পালন করছেন তাঁরা। তাঁদের মূল দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে— ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন, সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর স্বীকৃতি, কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য, সমস্ত বকেয়া ইনসেনটিভ ও ভাতা পরিশোধ, মাতৃত্বকালীন ছুটি-সহ সামাজিক সুরক্ষা। ডোমকল শাখার সম্পাদকিকা ফেরদৌসি বেওয়া বলেন, “আমরা আগাম অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত কর্মসূচি পালন করছিলাম। তা সত্ত্বেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পুলিশ আমাদের সঙ্গে অভব্য আচরণ ও হেনস্থা করেছে। আমরা মুর্শিদাবাদ থেকে এত কষ্ট করে কলকাতায় অভিযানে যোগ দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমাদের আটকে দেওয়া হয়। আমাদের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তার ন্যায্য বিচার চাই। দাবি না মানা হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।” তিনি আরও জানান, “ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন-সহ ১০ দফা দাবিতে আমরা এক মাস ধরে রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় গ্রামগঞ্জে করোনা মোকাবিলায় সামনে থেকে লড়াই করেছিলেন মহিলা আশাকর্মীরা। সেই সময় তাঁদের ‘প্রথম সারির যোদ্ধা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রসঙ্গ টেনে আশাকর্মী আসুরা খাতুন প্রশ্ন তোলেন, “আমরা যদি প্রথম সারির যোদ্ধা হই, তাহলে আজ পুলিশ দিয়ে কেন আমাদের হেনস্থা করা হচ্ছে? মাসের পর মাস টাকা না পেলে আমরা সংসার চালাব কীভাবে?” তিনি আরও বলেন, “আগামী ২ তারিখ বাজেট অধিবেশন রয়েছে। আমাদের কথা যেন সরকার ভাবে। আর বঞ্চনা করবেন না।”
ডোমকলের আশাকর্মী সামিনুর খাতুন জানান, তিনি কলকাতার অভিযানে যোগ দিতে রাত্রি ৩টেয় হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেই পুলিশ তাঁদের আটকে দেয়। ডেইলি ডোমকল-কে তিনি বলেন, “আমাদের স্টেশন থেকে বেরোতেই দেওয়া হয়নি। সকাল হতেই গোটা স্টেশন চত্বর ঘিরে ফেলে পুলিশ। বলা হয়, বেরোলেই গ্রেফতার করা হবে। অনেকেই বেরোতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেখানেও পুলিশ চরম হেনস্থা করে।” তাঁর অভিযোগ, “সকাল হতেই স্টেশন ঘিরে ফেলে পুলিশ আমাদের হুমকি দেয় যে বেরোলেই গ্রেপ্তার করা হবে। তা সত্ত্বেও অনেকে কর্মসূচিতে যোগ দিতে গেলে তাঁদের টেনে-হিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে আমাদের অনেকের শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন মহিলা হয়েও কীভাবে মহিলাদের ওপর এমন পুলিশি বর্বরতা সমর্থন করেন?” আশাকর্মীদের আন্দোলন ঘিরে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে বলেই স্পষ্ট জানিয়েছেন আশাকর্মীরা।
