ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তরাখণ্ডের পাউরি গাড়োয়াল জেলার কোটদ্বার এখন সংবাদের শিরোনামে। একটি সাধারণ পোশাকের দোকানের নামকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক উত্তজনা এবং সেই পরিস্থিতিতে এক হিন্দু জিম মালিকের অসামান্য সাহসিকতা ও মানবিকতার গল্প এখন সারা দেশে চর্চিত। একদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের হুমকি, অন্যদিকে সেই হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘মোহাম্মদ দীপক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সাক্ষী থেকেছে দেশ।
ঘটনার সূত্রপাত: দোকানের নাম নিয়ে বিতর্ক
ঘটনাটি ঘটে গত ২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনে। কোটদ্বারের প্যাটেল মার্গ এলাকায় প্রায় ৩০ বছর ধরে ‘বাবা স্কুল ড্রেসেস অ্যান্ড ম্যাচিং সেন্টার’ নামে একটি দোকান চালিয়ে আসছেন বছর সত্তর বয়সের বৃদ্ধ মোহাম্মদ শোয়েব (পুলিশ নথিতে ওয়াকিল আহমেদ)। সেদিন একদল যুবক, যারা নিজেদের বজরং দলের সদস্য বলে পরিচয় দেয়, শোয়েবের দোকানে চড়াও হয়। তাদের দাবি ছিল, দোকানের নাম থেকে ‘বাবা’ শব্দটি সরিয়ে ফেলতে হবে। তাদের যুক্তি, ‘বাবা’ শব্দটি শুধুমাত্র হিন্দু সাধু-সন্ত বা আরাধ্য দেবতা সিদ্ধবলি হনুমান মন্দিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন মুসলিম দোকানদার এই শব্দ ব্যবহার করতে পারবেন না। অভিযোগ উঠেছে, তারা শোয়েবকে নাম বদলাতে বাধ্য করে এবং এমনকি ধর্ম পরিবর্তনের জন্যও চাপ দেয়। অসহায় বৃদ্ধ যখন একদল মারমুখী যুবকের সামনে একা দাঁড়িয়ে, তখনই ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন স্থানীয় জিম মালিক ৪৬ বছর বয়সী দীপক কুমার।
‘আমার নাম মোহাম্মদ দীপক’: সাহসিকতার এক নতুন সংজ্ঞা
দীপক কুমার যখন ওই বৃদ্ধকে হেনস্তা হতে দেখেন, তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি সরাসরি ওই যুবকদের সামনে গিয়ে দাঁড়ান এবং বৃদ্ধের পক্ষ নিয়ে সওয়াল করেন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দীপক প্রশ্ন করছেন, “এই দোকান ৩০ বছর ধরে এখানে আছে, আজ কেন নাম বদলাতে হবে? অন্য সবাই তো ‘বাবা’ নাম ব্যবহার করতে পারে, ও কেন পারবে না?” তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে বজরং দলের সদস্যরা দীপকের পরিচয় জানতে চান। তারা বারবার জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কে এবং কেন একজন মুসলিমের পক্ষ নিচ্ছেন? এই সময় দীপক একটি ঐতিহাসিক উত্তর দেন। তিনি বলেন, “আমার নাম মোহাম্মদ দীপক।”
পরবর্তীতে এই অদ্ভুত নামের ব্যাখ্যা দিয়ে দীপক জানান, তিনি কোনো ধর্মীয় পরিচয় দিতে চাননি। বরং তিনি চেয়েছিলেন নিজের হিন্দু পরিচয়ের সাথে মুসলিম পরিচয়ের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ভারতের সংবিধান এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে তুলে ধরতে। তাঁর কথায়, “আমি হিন্দু নই, মুসলিম নই, শিখ বা খ্রিস্টানও নই। আমি সবার আগে একজন মানুষ। মৃত্যুর পর আমাকে ঈশ্বরের কাছে মানবতার জবাব দিতে হবে, কোনো ধর্মের নয়।”
পুলিশি রোষে দীপক
বিস্ময়করভাবে, এই ঘটনার পর উত্তরাখণ্ড পুলিশ দীপক কুমারের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করেছে। কোটদ্বার থানার পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রদীপ নেগি জানিয়েছেন, এই ঘটনায় মোট তিনটি এফআইআর করা হয়েছে:
১. প্রথম মামলা: দোকানদার ওয়াকিল আহমেদের অভিযোগের ভিত্তিতে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন বজরং দল কর্মীর বিরুদ্ধে, যারা তাঁকে ভয় দেখিয়েছিল এবং হেনস্তা করেছিল।
২. দ্বিতীয় মামলা: পুলিশের পক্ষ থেকে দায়ের করা হয়েছে ওই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, যারা জাতীয় সড়ক অবরোধ করে শান্তি বিঘ্নিত করেছিল।
৩. তৃতীয় মামলা: স্থানীয় বাসিন্দা কমল পালের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দীপক কুমার এবং আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দীপক অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, দীপকের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছায় আঘাত করা, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন এবং বেআইনি সমাবেশ। দীপক কুমার এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, যারা বৃদ্ধকে হেনস্তা করল তারা মুক্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ যে বাঁচাতে গেল তার বিরুদ্ধেই মামলা দেওয়া হল।
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘হিরো’ ও রাহুল গান্ধীর সমর্থন
ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে দীপক কুমারের প্রশংসা শুরু হয়। রাতারাতি তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ারের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যায়। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এক্স-এ লেখেন, “উত্তরাখণ্ডের দীপক ভারতের হিরো। দীপক সংবিধান এবং মানবতার জন্য লড়ছেন—সেই সংবিধান যা বিজেপি এবং সংঘ পরিবার প্রতিদিন পদদলিত করছে। তিনি ঘৃণার বাজারে ভালোবাসার এক জ্যান্ত প্রতীক।” রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার অসামাজিক উপাদানগুলোকে মদত দিচ্ছে যাতে সমাজে বিভাজন তৈরি হয়। তিনি দীপককে আশ্বস্ত করে বলেন, সারা দেশ তাঁর পাশে আছে এবং তাঁকে ভয় না পেয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন।
জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শরাফত আলী কাসমিও পুলিশের কাছে চিঠি লিখে দীপকের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, দীপক এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন এবং তাঁকে পুরস্কৃত করার বদলে হয়রানি করা হচ্ছে।
উত্তেজনা ও কড়া নিরাপত্তা
বর্তমানে কোটদ্বার এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। উত্তরপ্রদেশের বিজনোর জেলার সাথে কোটদ্বারের সীমানা সিল করে দেওয়া হয়েছে। পাউরি গাড়োয়ালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চন্দ্র মোহন সিং জানিয়েছেন, বাজারে নিয়মিত ফ্ল্যাগ মার্চ করা হচ্ছে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা কিছু ‘বহিরাগত’ এই গণ্ডগোলে ইন্ধন দিয়েছে। বর্তমানে দোকানদার ওয়াকিল আহমেদ তাঁর দোকানের নাম বদলাননি এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বজরং দলের নেতা নরেশ উনিয়াল দাবি করেছেন, দীপক এবং তাঁর সঙ্গীরাই আগে তাদের ওপর আক্রমণ করেছিলেন, তাই তাঁদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।
মানবতার জয়গান
উত্তরাখণ্ডের এই ঘটনাটি দেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীপক কুমারের মতো সাধারণ নাগরিক যখন ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কথা বলেন, তখন তা অনেকের কাছেই আশার আলো হয়ে দাঁড়ায়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার ঘটনাটি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও, কোটদ্বারের এই ‘মোহাম্মদ দীপক’ এখন এক আদর্শের নাম হয়ে উঠেছেন। এক বৃদ্ধ দোকানদারের অধিকার রক্ষায় নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষা তুচ্ছ করে তিনি যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা ভারতীয় সংবিধানের মূল স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতাকেই আরও একবার জোরালোভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
