নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: ডোমকল মহকুমা জুড়ে এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত শুনানি ঘিরে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের ছবি উঠে আসছে। খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকা বা তথাকথিত ত্রুটির কারণে নোটিস পেয়ে মহকুমা শাসকের দপ্তরে হাজির হচ্ছেন বহু বয়স্ক, নিরক্ষর ও প্রান্তিক মানুষ। কাগজের অভাব, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ‘বেনাগরিক’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছেন।
শুনানি আতঙ্কে শঙ্কর–সুপর্ণা
এসআইআর সংক্রান্ত হেয়ারিংয়ের নোটিস পেয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন ডোমকলের ভাতশালা এলাকার বাসিন্দা শঙ্কর মাল ও তাঁর স্ত্রী সুপর্ণা মাল। খসড়া ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও নথিগত ত্রুটির কারণে স্বামী–স্ত্রী দু’জনকেই শুনানির জন্য তলব করা হয়েছে। মঙ্গলবার ডোমকল মহকুমা শাসকের দপ্তরে চোখে-মুখে আতঙ্ক নিয়ে হাজির হন শঙ্কর–সুপর্ণা। হেয়ারিংয়ের সময়ের অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা যায় তাঁদের। কাগজপত্রের অভাবে যদি ‘বেনাগরিক’ বলে চিহ্নিত করা হয়, সেই আশঙ্কাই গ্রাস করেছে তাঁদের। যদিও ‘বেনাগরিক’ হওয়ার অর্থ ঠিক কী, সেটাও তাঁরা স্পষ্ট করে বুঝে উঠতে পারছেন না। তবে একটাই প্রশ্ন তাঁদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে—নিজের জন্মভূমিতেই কি মানুষ পরবাসী হয়ে যেতে পারে?

শঙ্কর ও সুপর্ণার কথায় উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের বসবাসের ইতিহাস। তাঁরা জানান, গত ৭০-৮০ বছর ধরে এই এলাকাতেই তাঁদের বসবাস। তাঁদের বাবা-দাদারাও এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বহু বছর আগে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অন্য কারণে তাঁদের বাড়িঘর ভেঙে গিয়ে সর্বস্ব নষ্ট হয়ে যায়। সেই সময়কার বহু পুরনো কাগজপত্রও হারিয়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।
শুনানির জন্য তাঁরা সঙ্গে এনেছেন ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এবং রেশন কার্ড। তবে প্রশাসনের তরফে যে নির্দিষ্ট সময়ের জমির দলিল ও অন্যান্য নথিপত্র চাওয়া হচ্ছে, তা তাঁদের কাছে নেই। শঙ্কর মাল বলেন, “যে সময়ের কাগজ চাইছে, সেই সময় তো আমাদের বাড়িঘরই ভেঙে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কাগজ কোথা থেকে আনব?” এসআইআর-এর নোটিসে যে ১৩ ধরনের নথিপত্র জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার অধিকাংশই তাঁদের কাছে নেই। ফলে শুনানির ফল কী হবে, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শঙ্কর ও সুপর্ণা। এসআইআর হেয়ারিং ঘিরে শঙ্কর–সুপর্ণার মতো বহু সাধারণ মানুষ আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
শেষ বয়সে কাগজ জটে রঞ্জিত সরকার
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের বৈধ ভোটার পরিচয় প্রমাণ করতে হেয়ারিংয়ের লাইনে দাঁড়িয়েছেন ডোমকলের মাহিষ্যপাড়ার বাসিন্দা রঞ্জিত সরকার (৬৬)। দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিয়ে আসা এক সাধারণ নাগরিকের কাছে এই অভিজ্ঞতা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। রঞ্জিতবাবু জানান, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকার কারণ দেখিয়ে তাঁকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। সেই নোটিসের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার তাঁর হেয়ারিংয়ের দিন ছিল ডোমকল মহকুমা শাসকের দপ্তরে। তিনি বলেন, “আজ আমার হেয়ারিংয়ের দিন, তাই এখানে এসেছি। আমার আর কী করার আছে! আমি তো সাধারণ নাগরিক। কমিশনের কর্তারা যা ভালো বুঝবেন, তাই করবেন।”

৬৬ বছর ধরে এই দেশেই বসবাস করা, বছরের পর বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ করার পরেও আবার বৈধ ভোটারের প্রমাণ দিতে হওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন রঞ্জিত সরকার। তিনি বলেন, “ভাবতেই শিউরে উঠছি। এত বছর ধরে যে দেশে বাস করছি, সেখানে আবার নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে।” রঞ্জিতবাবুর জন্মস্থান মুর্শিদাবাদ জেলার রানিনগর থানার কাতলামারি মোহনগঞ্জে। ১৯৭৫ সালে ডোমকলে চলে আসেন এবং তারপর থেকেই এই এলাকার ভোটার তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। তবে কেন ২০০২ সালের তালিকায় তাঁর নাম নেই, তা তিনি নিজেও জানেন না। তাঁর দাবি, ২০০২ সালের আগের ভোটার তালিকায় শুধু তাঁর নয়, তাঁর বাবা-দাদাদের নামও নথিভুক্ত রয়েছে।
এসআইআর সংক্রান্ত শুনানি ঘিরে শঙ্কর–সুপর্ণা ও রঞ্জিত সরকারের মতো বহু প্রবীণ নাগরিকের মনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বসবাস ও ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে এসে কাগজের জটিলতায় তাঁদের যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। শেষ বয়সে এসে কাগজের অভাবে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি যে গভীর মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা স্পষ্ট।
