TOP NEWS

৯ বছরে ১৬ বার জেলের বাইরে গুরমিত রাম রহিম, ৪৩৬ দিন প্যারোলে কাটানো নিয়ে সরব বিশিষ্টরা

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: দুই শিষ্যাকে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ডেরা সাচ্চা সওদা প্রধান গুরমিত রাম রহিম সিংকে আবারও ৩০ দিনের প্যারোল মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার হরিয়ানা রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আধিকারিকরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ২০১৭ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকে এই নিয়ে গত ৯ বছরে মোট ১৬ বার প্যারোল মুক্তি পেলেন স্বঘোষিত ধর্মগুরু। জানা যায়, বুধবার সকাল আনুমানিক ৬টা ৩৪ মিনিটে অত্যন্ত সাধারণ নিরাপত্তা প্রহরার মধ্য দিয়ে জেলের মূল ফটক থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। তাঁর আইনজীবী জিতেন্দ্র খুরানা জানিয়েছেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন মেলার পরই এই প্যারোল কার্যকর হয়েছে। এই ১ মাস রাম রহিম সিং হরিয়ানার সির্সায় অবস্থিত ডেরা সাচ্চা সওদা-র মূল সদর দফতরেই অবস্থান করবেন।

হরিয়ানা সৎচরিত্র বন্দি (সাময়িক মুক্তি) আইন, ২০২২-এর অধীনে বারবার প্যারোল ও ফার্লো পেয়ে আসছেন রাম রহিম। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের ৩০ দিন মিলিয়ে তিনি সাজা ঘোষণার পর থেকে মোট ৪৩৬ দিন জেলের বাইরে কাটানোর সুযোগ পেলেন। প্রসঙ্গত, ডেরা প্রধানের কুকীর্তি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সাংবাদিক রামচন্দ্রকে খুন করা হয়। বিশেষ সিবিআই আদালত এই মামলায় রাম রহিমসহ কুলদীপ সিং, নির্মল সিং ও কিষাণ লালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানা করেছিল। কিন্তু উচ্চ আদালত সম্প্রতি তাদের খালাস দেয়। ২০০২ সালের জুলাই মাসে হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রে নিজের খামারে গুলি করে খুন করা হয়েছিল ডেরার প্রাক্তন ম্যানেজার রঞ্জিত সিংকে। পাঁচকুলার বিশেষ সিবিআই আদালত এই মামলায় রাম রহিমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও উচ্চ আদালতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ধর্ষণ মামলায় সাজা খাটলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুটি বড় খুনের মামলা থেকে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে খালাস পেয়েছেন ডেরা প্রধান।

ধর্ষণের মতো অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত একজন প্রভাবশালী বন্দিকে বারবার এভাবে আইনি ছাড় দেওয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক, বিরোধী নেতা এবং সমাজকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে নতুন করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই এক্স হ্যান্ডেলে রাম রহিমের এই মুক্তির সাথে দিল্লির দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রায় ৬ বছর ধরে বিনা বিচারে বন্দি থাকা সমাজকর্মী উমর খালিদের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি লেখেন, “গুরমিত রাম রহিম সিংকে আরও একবার প্যারোল দেওয়া হলো… অন্যদিকে, উমর খালিদের মতো মানুষেরা প্রায় ৬ বছর ধরে জেলে পচছেন, অথচ এখনও তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়াই শুরু হলো না। একেই বলে আমাদের বিচার ব্যবস্থা!”

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডেরা সাচ্চা সওদা-র অনুগামী সংখ্যা পঞ্জাব, হরিয়ানাসহ উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে কয়েক লক্ষ। রাম রহিমের নেতৃত্বে এই সংগঠন যেমন নিজেদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বাড়িয়েছিল, ঠিক তেমনই তাদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, ভীতি প্রদর্শন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠেছিল। প্যারোল মুক্তি নিয়ে কড়া সমালোচনা করে কংগ্রেস নেত্রী ডাঃ শামা মহম্মদ লিখেছেন, “দেশে যা-ই ঘটে যাক না কেন, সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষক আসারাম বা গুরমিত রাম রহিমের মতো স্বঘোষিত বাবাদের প্যারোল পাওয়া কখনোই বন্ধ হয় না।” অন্য দিকে, প্রবীণ সাংবাদিক পদ্মজা জোশীসহ অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই ধরণের ঘটনা দেশের সাধারণ মানুষের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে ভরসা সম্পূর্ণ কমিয়ে দিচ্ছে।

আইনের চোখে সকলেই সমান— ভারতের সংবিধানের এই মূল ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রভাবশালী অপরাধীরা কীভাবে বারবার মুক্ত বাতাস গায়ে লাগাচ্ছেন। আর হাজার হাজার সাধারণ বিচারাধীন বন্দি বছরের পর বছর শুনানির অপেক্ষায় জেলের অন্ধকূপে দিন কাটাচ্ছেন। এই ঘটনা তা আরও একবার প্রমাণ করল। রাজনৈতিক সান্নিধ্য ও ক্ষমতাই কি এ দেশে মুক্তির আসল চাবিকাঠি? রাম রহিমের ৪৩৬ দিনের কারামুক্তি আজ সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নকেই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!