ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণীর উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য আনা ‘অন-স্করিন মার্কিং’ (OSM) প্রযুক্তি এবং ‘কোয়েম্পট’ নামক একটি সংস্থাকে চুক্তি দেওয়া নিয়ে দেশজুড়ে চলা বিতর্ক এবার আরও তীব্র রূপ ধারণ করল। শুক্রবার এই ইস্যুতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিশানা করলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের বিক্ষোভ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী এই কেলেঙ্কারি নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব এবং তিনি শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, সিবিএসই-র ওএসএম (OSM) ব্যবস্থা চালু করা এবং কোয়েম্পট সংস্থাকে এই কাজের বরাত দেওয়ার নেপথ্যে কী সমীকরণ ছিল, তা খতিয়ে দেখতে শুরু থেকেই একটি স্বাধীন বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন রিপোর্ট শেয়ার করে কংগ্রেস নেতা অভিযোগ করেন, সিবিএসই এই ওএসএম প্রজেক্টের জন্য তিনবার টেন্ডার বা দরপত্র ডেকেছিল। কিন্তু একটি বিশেষ সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দিতে বারবার নিয়মের রদবদল করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভারতের বৃহত্তম আইটি পরিষেবা সংস্থা টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (TCS) তৃতীয় রাউন্ডে সমস্ত দিক থেকে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের চুক্তি দেওয়া হয়নি। রাহুল গান্ধীর ভাষায়, “টিসিএস হেরে গেল। আর অতীতের ব্যর্থতার ট্র্যাক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও কোয়েম্পট জিতে গেল।” তিনি দাবি করেন, নিয়মের এই শিথিলতার কারণেই আজ ছাত্রছাত্রীদের ঝাপসা স্ক্যান, উত্তরপত্রের পাতা নিখোঁজ হওয়া এবং মূল্যায়ন পোর্টালের যান্ত্রিক ত্রুটির মতো চরম হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। শিক্ষকেরা সিবিএসই-কে আগেই সতর্ক করেছিলেন, দেশজুড়ে এই প্রযুক্তি চালু করার আগে অন্তত ১ থেকে ২ বছরের প্রস্তুতির প্রয়োজন। কিন্তু সেই সতর্কতাও সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তোলেন, “১৮.৫ লাখ শিশুর ভবিষ্যৎ এমন একটি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হলো, যাদের জেতাতে নিয়ম ভাঙতে হয়েছিল। কার স্বার্থে ধাপে ধাপে এই নিয়ম শিথিল করা হলো?”
বিজেপি নেতাদের সমালোচনার জবাবে রাহুল গান্ধী বিচারবিভাগীয় তদন্তের পরিধি আরও বাড়িয়ে কোয়েম্পট-কে দেওয়া সমস্ত চুক্তি খতিয়ে দেখার দাবি জানান। সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “মোদীজি, সিবিএসই-র এই বিপর্যয় নিয়ে আপনার নীরবতা এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না করার নিষ্ক্রিয়তাই দেশকে বুঝিয়ে দিচ্ছে আপনার আসল চিন্তা কোথায়। লাখ লাখ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার কোনও মাথাব্যথা নেই, আপনার নজর শুধু নিজের সরকার টিকিয়ে রাখার দিকে।”
অন্য একটি পোস্টে নিট (NEET) পরীক্ষার্থীদের সাথে তাঁর সাম্প্রতিক বৈঠকের কথা উল্লেখ করে রাহুল দাবি করেন, দেশের যুবসমাজ বর্তমান সরকারের পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে জানিয়েছে যে হোয়াটস্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে কীভাবে প্রশ্নপত্র বিক্রি হয় এবং প্রশ্ন ফাঁসের এই জাল কীভাবে কাজ করে। রাহুল গান্ধীর প্রশ্ন, “সাধারণ পড়ুয়ারা যদি এই দুর্নীতির শিকড় চিনতে পারে, তবে সরকার ও দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলি কেন তা ধরতে পারছে না?”
এই বিতর্কে সুর চড়িয়েছেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশও। তিনি অভিযোগ করেন, সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণীর ওএসএম ব্যবস্থার জন্য চূড়ান্ত রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) বা দরপত্র জারি করা হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে— যা বোর্ড পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র ৬ মাস আগে। কোনও আঞ্চলিক সেন্টারে পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক মহড়া না চালিয়েই এই ব্যবস্থা চালুর পেছনে গভীর রহস্য রয়েছে। জয়রাম রমেশ প্রশ্ন তোলেন, কোয়েম্পট সংস্থাটি (যা আগে গ্লোবেরেনা বা Globarena নামে পরিচিত ছিল এবং অতীতেও বিতর্কে জড়িয়েছিল) সম্পর্কে কি কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন করা হয়েছিল? মোদী সরকারের রাজনৈতিক প্রভুদের চাপেই কি এই সংস্থাকে চুক্তি দেওয়া হলো? কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সিবিএসই যেন অবিলম্বে ভেন্ডার নির্বাচন, টেন্ডারের শর্ত পরিবর্তন এবং পরীক্ষার আগে হওয়া সমস্ত বৈঠকের কার্যবিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ করে। ধামাচাপা না দিয়ে ‘প্রধানমন্ত্রী’ যেন কাদা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ করে এই নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলির উত্তর দেন, এমনটাই দাবি বিরোধী শিবিরের।
