TOP NEWS

“মারলে মারো, মাথা নত করব না”: ওয়াই চ্যানেলে ধর্নায় বিজেপি-কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৃণমূল সুপ্রিমোর

Image Credit: AITC

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর প্রথমবার রাজপথে নেমে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু সেই কর্মসূচিই পরিণত হল বিশৃঙ্খলা, অস্বস্তি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতীকে। ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে আয়োজিত ‘গণতন্ত্র ফেরাও’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে এসে চরম বিশৃঙ্খলার মুখে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তাঁকে মাঝপথে বক্তৃতা থামিয়ে দিতে হয়। কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণহীন ভিড়, স্লোগানের চাপে বক্তব্য শোনা না যাওয়া এবং মঞ্চ তৈরির অনুমতি না মেলায় কার্যত অগোছালো পরিবেশে কর্মসূচি চালাতে বাধ্য হয় তৃণমূল নেতৃত্ব।

এই ধর্না শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; বরং রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর তৃণমূলের অস্তিত্ব, সাংগঠনিক শক্তি এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যেই তা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছিল। সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার অভিযোগ এবং ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাসের প্রতিবাদকে সামনে রেখে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্মসূচির শুরু থেকেই নানা কারণে তা বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

শুরু থেকেই অস্বস্তি

তৃণমূলের মূল পরিকল্পনা ছিল ধর্মতলার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে অবস্থান বিক্ষোভ আয়োজন করা। কিন্তু কলকাতা পুলিশ সেই স্থানে অনুমতি দেয়নি। পরিবর্তে ওয়াই চ্যানেলে ধর্নার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সেখানে মঞ্চ নির্মাণ কিংবা পূর্ণাঙ্গ সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের অনুমতি মেলেনি। ফলে শেডের নিচে এবং রেলিংয়ের ধারে বসেই কর্মসূচি পরিচালনা করতে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

দুপুরের পর কালীঘাটের বাসভবন থেকে বেরিয়ে প্রথমে রেড রোডে ড. ভীমরাও রামজি অম্বেডকরের মূর্তিতে মাল্যদান করেন মমতা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, অসীমা পাত্রসহ অন্যান্য নেতারা। সেখান থেকে সরাসরি তিনি পৌঁছে যান ওয়াই চ্যানেলের ধর্নামঞ্চে। সকাল থেকেই সেখানে তৃণমূলের বিধায়ক, কাউন্সিলর, জেলা নেতৃত্ব এবং কর্মী-সমর্থকদের ভিড় জমতে শুরু করে। উপস্থিত ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, দোলা সেন, কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিল গিরি, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, নাদিমুল হক, আমিরুল ইসলাম, ফিরহাদ হাকিম এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় ছিল, সদ্য নির্বাচিত নতুন বিধায়কদের অনেককেই সেখানে দেখা যায়নি। বরং মমতার পাশে ছিলেন দলের দীর্ঘদিনের পুরনো নেতারা। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই অনুপস্থিতি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তিরই ইঙ্গিত বহন করছে।

কর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে কার্যত ‘অবরুদ্ধ’ মমতা

ওয়াই চ্যানেলে পৌঁছনোর পর থেকেই বিশৃঙ্খলার ছবি সামনে আসতে থাকে। কর্মী-সমর্থকদের বিপুল ভিড়ের কারণে নিরাপত্তা বলয় কার্যত ভেঙে পড়ে। মমতাকে ঘিরে ধরে স্লোগান দিতে থাকেন উপস্থিত সমর্থকেরা। শুরুতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ধীরে ধীরে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মমতা বক্তৃতা শুরু করলেও বারবার থামতে বাধ্য হন। চারদিকে ‘জয় বাংলা’ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে তাঁর বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই শোনা যাচ্ছিল না। উপস্থিত নেতারা কর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও তাতে খুব একটা ফল মেলেনি। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন হয় যে, মমতা কার্যত জনতার মধ্যেই আটকে পড়েন। তাঁকে ঘিরে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে থাকেন। পরে পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে ভিড় সরানোর চেষ্টা করে। তবেই কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফেরে।

বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ

বিশৃঙ্খলার মধ্যেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ দাগেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, দিল্লি থেকে পরিকল্পিতভাবে তৃণমূলকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। তাঁর দাবি, “বিজেপি বাদে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আজ আমাকে এবং আমার দলকে রাজনৈতিকভাবে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।” মমতা আরও বলেন, “যদি বেঁচে থাকি, বিজেপিকে সরিয়েই যাব। আমাদের বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং দলীয় কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। বেআইনি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা মাথা নত করব না।” তিনি অভিযোগ করেন, ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের উপর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁদের দলত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সোনারপুরে অভিষেক-কাণ্ড তুলে আক্রমণ

বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার প্রসঙ্গ। মমতার দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা ছিল। তিনি বলেন, “অভিষেকের মাথায় হেলমেট না থাকলে পাথর সরাসরি মাথায় লাগত। ওকে মারার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তবুও সে নিহত কর্মীর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়েছে।” অভিষেকের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়েও অভিযোগ তোলেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর দাবি, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসা শুরু করতে নানা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়েছিল। মমতার বক্তব্য, “পুলিশ হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলিকে ভয় দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক।”

অনুমতি বিতর্কে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

ধর্নার অনুমতি সংক্রান্ত বিষয়েও পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, ইচ্ছাকৃতভাবেই রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “আমাদের মাইক ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়নি। হ্যান্ড মাইক নিয়ে বক্তব্য রাখতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে আমাকে আটকানো যাবে না। যেখানে পারব, সেখানেই বসব।” তিনি আরও জানান, অম্বেডকরের মূর্তিতে মাল্যদান এবং সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন তিনি। গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও করেন।

পুলিশকে হুঁশিয়ারি, আবার সমবেদনাও

ধর্নামঞ্চ থেকে একদিকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অন্যদিকে পুলিশকর্মীদের প্রতি সহানুভূতির সুরও শোনা যায় মমতার বক্তব্যে। তিনি বলেন, “যাঁরা ধর্নায় আসছেন, তাঁদের ঢুকতে দিতে হবে। না হলে লালবাজার ঘেরাও হবে, নবান্ন ঘেরাও হবে, থানা ঘেরাও হবে।” তবে পরক্ষণেই তিনি যোগ করেন, “আমি পুলিশকে দোষ দিচ্ছি না। ওরা নির্দেশ পালন করে। প্রশাসনে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, চেয়ার যা বলে, পুলিশ তাই করে।”

দল ভাঙার জল্পনায় নতুন চাপ

ওয়াই চ্যানেলে যখন মমতা কর্মসূচিতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দেয় বিধানসভার একটি সমান্তরাল ঘটনা। বিদ্রোহী বিধায়ক গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে বিধানসভায় পৌঁছন তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পিকারের কাছে চিঠি জমা দেওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয় যে, তাঁরা হয়তো নতুন একটি তৃণমূল গোষ্ঠী গঠনের পথে এগোচ্ছেন। পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলেন রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়। তাঁর দাবি, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে প্রায় ৫০ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে। এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা বিভাজনের ঘটনার সঙ্গে তুলনা টানা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, পশ্চিমবঙ্গেও কি একই ধরনের রাজনৈতিক ভাঙনের পথে এগোচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস?

বিরোধী দলনেতা নিয়ে বিতর্ক

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, অতীতে সংখ্যার নিরিখে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ম মেনেও তৃণমূলকে সেই মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে নাম পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে অযথা জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। সই সংক্রান্ত বিতর্ক প্রসঙ্গে মমতার দাবি, তাঁর কাছে ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষাও করা যেতে পারে। তবে তা বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া আটকে দেওয়ার কারণ হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘অস্তিত্বরক্ষার লড়াই’ হিসেবে ধর্না

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধর্না ছিল কেবল ভোট-পরবর্তী হিংসার প্রতিবাদ নয়। বরং নির্বাচনে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর সংগঠনকে একত্রিত রাখা, কর্মীদের মনোবল ফেরানো এবং দল ভাঙনের আশঙ্কার বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা। কিন্তু কর্মসূচির মধ্যে যে বিশৃঙ্খলা দেখা গেল, তা তৃণমূলের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার অভিযোগ, অন্যদিকে দলীয় বিধায়কদের ভাঙনের জল্পনা— এই দুই চাপের মাঝেই মমতার নেতৃত্ব এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। ধর্নামঞ্চ থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, “মারলে মারুন। কিন্তু যতদিন কণ্ঠস্বর আছে, ততদিন মাথা নত করব না। আমি সব জায়গায় যাব। আগাম জানিয়ে যাব না। মানুষের পাশে থাকব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!