ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: সমস্ত গৃহবধূ বা গৃহিণীদের নিঃস্বার্থ ও অমূল্য গৃহস্থালি কাজকে এক নজিরবিহীন আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি দিল দেশের শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, গৃহবধূরা আসলে সাধারণ কেউ নন, তাঁরা হলেন “দেশ নির্মাতা”। ঘরের ভেতরে তাঁদের করা অদৃশ্য ও পারিশ্রমিকহীন শ্রমের ওপর ভিত্তি করেই পুরো সমাজ চাকা সচল রাখে।
একটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক গৃহবধূর পরিবারের ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি সংক্রান্ত মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, কোনো গৃহবধূর মৃত্যুর পর তাঁর ‘পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ সেবা’-র ক্ষতিকে এখন থেকে ক্ষতিপূরণের একটি সম্পূর্ণ পৃথক এবং সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করতে হবে। এই ক্ষতি নির্ধারণের জন্য গৃহবধূদের একটি কাল্পনিক মাসিক আয় ৩০,০০০ টাকা ধার্য করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিং-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন।
আদালত শুনানির সময় অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্যের ওপর জোর দিয়ে গভীর আশাবাদ প্রকাশ করে যে, এবার থেকে ‘হোমমেকার’ (গৃহিণী) শব্দটি সমাজে ‘নেশন বিল্ডার’ (দেশ নির্মাতা) হিসেবে পরিচিতি পাবে। ডিভিশন বেঞ্চ তাঁর পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে উল্লেখ করে, “গৃহবধূরা প্রতিটি পরিবারে অপরিসীম অবদান রাখেন। তাঁরাই আসলে দেশ গড়ে তোলেন। আপনি কীভাবে তাঁদের এই অবদানকে মূল্যায়ন করবেন এবং তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করবেন? গৃহবধূরা সমাজের সেই অদৃশ্য ভিত্তি প্রদান করেন যার ওপর দাঁড়িয়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থা সচল থাকে। একজন হাই-ফ্লাইং ব্যবসায়ী, সফল রাজনীতিবিদ, নামী শিল্পী ও ঝানু আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ দিনমজুর—প্রত্যেকেই যে বাইরে গিয়ে নিজের কাজে সাফল্য পাচ্ছেন, তার পিছনে নীরব স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেন এই গৃহবধূরাই।”
আদালত আরও জানিয়েছে, গৃহবধূদের এই অবদান পুরোপুরি অদৃশ্য বা আংশিক দৃশ্যমান হলেও, দেশের অগ্রগতিতে পরোক্ষভাবে অবদান রাখা প্রতিটি মানুষের সাফল্যের পিছনে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আদালত এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করে আশা প্রকাশ করেছে যে, দেশের সমস্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিরা এই বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন, যাতে মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলাগুলিতে গৃহবধূদের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় এই নতুন নিয়ম সঠিকভাবে মেনে চলা হয়।
এই ঐতিহাসিক রায়ের পিছনে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘ ২৫ বছরের আইনি লড়াইয়ের করুণ ইতিহাস। ২০০১ সালের ২৫ নভেম্বর সিরসা থেকে ফতেহাবাদ যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় এক নারী প্রাণ হারান। ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিরসার ‘মোটর এক্সিডেন্ট ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল’ নিহতের পরিবারকে মাত্র ২.৪২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়।
এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০০৪ সালে পরিবারটি পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। কিন্তু ২০১১ সালে হাইকোর্টের নথিপত্র রাখার ঘরে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জেরে এই মামলার সমস্ত রেকর্ড পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। সেই নথিপত্র পুনর্গঠন করতে বছরের পর বছর কেটে যায় এবং মামলাটি প্রায় দুই দশক ধরে ঝুলে থাকে। পরবর্তীতে, হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে যাওয়া ফাইলের নিষ্পত্তির জন্য ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জারি করা একটি প্রশাসনিক নির্দেশের পর, হাইকোর্ট অবশেষে ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ওই পরিবারের ক্ষতিপূরণ বাড়িয়ে সুদের হার সহ ৮.৪৩ লক্ষ টাকা করে। কিন্তু তাতেও ন্যায়বিচার না মেলায় দাবিদাররা সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন দায়ের করেন, যা অবশেষে এই যুগান্তকারী রায়ে রূপ নিল।
আদালত তার রায়ের শেষে জোর দিয়ে বলেছে, গৃহবধূদের কাজের এই আর্থিক মূল্যায়ন কেবল কোনো গাণিতিক হিসাব বা ক্ষতিপূরণের টাকা বাড়ানোর সাধারণ চেষ্টা নয়; বরং এটি সমাজে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা লিঙ্গবৈষম্যমূলক চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করার এবং ‘কোন কাজটি মূল্যবান আর কোনটি নয়’—সংক্রান্ত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনর্নির্ধারণ করার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
