ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: “অনার কিলিং বা সম্মানরক্ষার্থে হত্যা আসলে আর কিছুই নয়, তা হলো উগ্র জাতিভেদের এক চরম ও নৃশংস প্রতিফলন। সূর্য সবাইকে আলো দেয়, বৃষ্টি সবার ওপর ঝরে এবং বাতাসও সবাই সমানভাবে ভাগ করে নেয়। প্রকৃতি যখন কোনো জাতপাত চেনে না, তখন মানুষ কেন এই কৃত্রিম প্রাচীর তুলবে?”—তামিলনাড়ুতে অনার কিলিংয়ের ক্রমবর্ধমান ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ দিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। তিরুনেলভেলির ২৭ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কাভিন সেলভাগণেশের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এক পুলিশ অফিসারের জামিন মামলার শুনানিতে এই মন্তব্য করেন বিচারপতি বি পুগলেন্ধি। একই সাথে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, “তথাকথিত এই অনার কিলিংয়ের মধ্যে কোনো ‘অনার’ বা সম্মান নেই, এটি আসলে একটি চরম লজ্জাজনক অপরাধ।”
সুপ্রিম কোর্টের একটি পুরোনো রায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্ট জানায়, জাতিভেদ প্রথা দেশের বুকে এক অভিশাপ। বিচারপতি বি পুগলেন্ধি দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, তামিলনাড়ুতে গত এক দশকে অন্তত ৫৯টি অনার কিলিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। জাতিগত কুসংস্কার মানুষের মনে এতটাই গভীরভাবে গেঁথে গেছে যে, তা পুরো প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেছে, দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণীর সুরক্ষার্থে তৈরি ‘তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইন, ১৯৮৯’ সমাজ থেকে এই অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। কারণ এই আইনের অধীনে মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে স্কুল স্তর থেকেই নতুন প্রজন্মের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে আদালত। দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া বীর জওয়ানদের উদাহরণ টেনে বিচারপতি বলেন, “শত্রুর বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের জন্য যখন জওয়ানরা প্রাণ বলিদান দেন, তখন তাঁদের রক্ত বা দেশপ্রেমের ওপর কোনো জাতপাতের সিলমোহর থাকে না।”
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, চেন্নাইয়ের একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত তরুণ কাভিন সেলভাগণেশ ‘হিন্দু দেবেন্দ্র কুলা ভেল্লালার’ (তপশিলী) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ‘হিন্দু মারাভার’ (উচ্চবর্ণ) সম্প্রদায়ের এক তরুণীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এই সম্পর্কের জেরে গত বছরের ২৭ জুলাই তিরুনেলভেলি জেলায় কাভিনকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। সরকারি কৌঁসুলির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই তরুণীর ভাই এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত। তবে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় তরুণীর বাবা সারাভাননকেও। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ঘটনার সময় সারাভানন এবং তাঁর স্ত্রী—উভয়েই পুলিশ বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং সাব-ইন্সপেক্টর পদে আসীন ছিলেন।
এর আগে মাদ্রাজ হাইকোর্ট এবং নিম্ন আদালত—উভয় জায়গাতেই সারাভাননের জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে গিয়েছিল। এবার পুনরায় হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলে আদালত লক্ষ্য করে, মামলার চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে এবং মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ রয়েছে। অভিযুক্ত সারাভানন প্রায় ১০ মাস ধরে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। আদালত জানায়, বিচার শুরু হওয়ার আগেই দীর্ঘকাল আটকে রাখা এক প্রকার ‘প্রাক-বিচার কারাদণ্ড’-র শামিল। তাই কিছু অত্যন্ত কড়া শর্ত সাপেক্ষে তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছেন বিচারপতি। আদালতের নির্দেশ, জামিনে থাকাকালীন সারাভানন ঘটনাস্থলে যেতে পারবেন না। তাঁকে কোয়েম্বাটোরে বসবাস করতে হবে। কোয়েম্বাটোরের স্থানীয় থানায় প্রতিদিন দু’বার করে হাজিরা দিতে হবে তাঁকে। ১ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড এবং সমপরিমাণ অর্থের দু’জন জামিনদার জমা দিতে হবে। তাঁকে এই মর্মে একটি হলফনামা দিতে হবে যে, তিনি জামিনের স্বাধীনতার অপব্যবহার করবেন না, কোনো সাক্ষীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না এবং ট্রায়াল চলাকালীন কোনো অপরাধে জড়াবেন না।
