TOP NEWS

গণপিটুনি মামলায় ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’ দিয়ে হুমকির শিকার মহিলা বিচারক, ধর্মীয় পরিচয় তুলে কুৎসিত আক্রমণ

ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: ২০২২ সালের একটি কুখ্যাত গণপিটুনি (Mob lynching) মামলায় সাতজন দোষীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর, সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র হুমকি ও কুৎসিত আক্রমণের শিকার হলেন মধ্যপ্রদেশের এক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক। ঘটনাটি ঘটেছে মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরম জেলায়। আক্রান্ত বিচারকের নাম তবসুম খান। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের করেছে এবং বিচারক তবসুম খানের নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মামলাটি ২০২২ সালের ২ ও ৩ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতের। ট্রাক চালক শেখ লালা নাজির আহমেদ এবং শেখ মুস্তাক নামের দুই ব্যক্তি একটি ট্রাকে করে গবাদি পশু নিয়ে মহারাষ্ট্রের দিকে যাচ্ছিলেন। সেই সময় সেওনি মালওয়ার বারখাণ্ড গ্রামের কাছে লাঠি ও কাঠের রড নিয়ে একদল উন্মত্ত জনতা তাঁদের গাড়িটি আটকায়। গো-পাচারের সন্দেহে তাঁদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালানো হয়। গণপিটুনির জেরে গুরুতর আহত হয়ে নাজির আহমেদের মৃত্যু হয়, তবে শেখ মুস্তাক কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান। গত ১২ জুন, এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারক তবসুম খান পর্যবেক্ষণ করেন যে—প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে যে অভিযুক্তরা “চরম নৃশংসতার” সাথে নাজির আহমেদকে পিটিয়ে মেরেছে। তিনি ‘মব লিঞ্চিং’ বা গণপিটুনিকে একটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ৭ জন অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন।

আদালতের এই কড়া রায়ের পরই আদালত চত্বরের বাইরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। দোষীদের সাজা ঘোষণা করে যখন পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন তাদের আত্মীয়রা পুলিশের গাড়ি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর ঠিক কয়েকদিন পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিচারক তবসুম খানকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় তুলে টার্গেট করা শুরু হয়। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু ব্যক্তি বিচারককে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে এবং দোষীদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা দাবি করছে, এই সাজা বাতিল করতে হবে এবং তারা অভিযোগ তুলেছে যে বিচারক ধর্মের ভিত্তিতে এই রায় দিয়েছেন। এমনকি কিছু জায়গায় ওই মহিলা বিচারকের কুশপুতুল দাহ করার ভিডিও-ও সামনে এসেছে।

আদালতের একটি আইনি রায়কে সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন দেশের আইনজীবী মহল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। রাজ্যসভার সাংসদ তথা কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা পবন খেরা এই প্রচারের তীব্র নিন্দা করে বলেন, “দোষী সাব্যস্ত হওয়া সাতজন ব্যক্তিই হিন্দু, এটা সত্যি। কিন্তু তাঁদের হিন্দু ধর্মের জন্য সাজা দেওয়া হয়নি; তদন্তে দাঙ্গা, খুনের চেষ্টা এবং ঠাণ্ডা মাথায় খুনের অপরাধে তাঁরা দোষী প্রমাণিত হয়েছেন বলেই আদালত তাঁদের সাজা দিয়েছে।”

অনলাইন ক্যাম্পেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর সেওনি মালওয়া থানা পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র বিভিন্ন ধারায় শত্রুতা ছড়ানো এবং শান্তিভঙ্গের চেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা রুজু করেছে। নর্মদাপুরমের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ASP) অভিষেক রঞ্জন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “আমরা এই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করেছি। তবে সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলির পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমাদের সাইবার সেল সহ বিভিন্ন শাখা এই পোস্টগুলির উৎস ট্র্যাক করার চেষ্টা করছে। সমাজমাধ্যমে কী ধরণের ধারণাগঠন বা পারসেপশন তৈরির চেষ্টা চলছে, তার ওপর আমরা কড়া নজর রাখছি। একই সাথে বিচারক তবসুম খানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় করা হয়েছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!