TOP NEWS

৫ মাসে মৃত ৫৫ সাফাই কর্মী, জুনেই দিল্লিতে প্রাণ গেল ৯ জনের: রিপোর্ট প্রকাশ ড্যাসামের

ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: দেশে হাতে করে আবর্জনা পরিষ্কার করা তথা ‘ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, বাস্তব চিত্রটা যে কতটা ভয়ঙ্কর ও নৃশংস—এক রিপোর্টে তা ফের একবার প্রমাণ হলো। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে মাত্র ৫ মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নর্দমা এবং সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে অন্তত ৫৫ জন সাফাই কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার ও দলিত অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘দলিত আদিবাসী শক্তি অধিকার মঞ্চ’ (ড্যাসাম)-এর সোমবার প্রকাশিত একটি রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সংগঠনটি এই লাগাতার মৃত্যুকে জাতিগত হিংসা, ঠিকাদারদের শোষণ এবং প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার এক চরম নিদর্শন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

ড্যাসাম-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১ জন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ১০ জন, মে মাসে ৬ জন এবং জুন মাসে ১৮ জন সাফাই কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেশের রাজধানী দিল্লির। জুন মাসে মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ৯ জনই দিল্লির বাসিন্দা। সংগঠনটির অভিযোগ, সরকারি স্তরে দেশে ‘ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং’ সম্পূর্ণ নির্মূল করা হয়েছে এবং যান্ত্রিকীকরণ চালু হয়েছে বলে যে দাবি করা হয়, এই তথ্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইনি দায় এড়াতে এবং জবাবদিহিতা থেকে বাঁচতে প্রশাসন প্রায়শই এই মৃত্যুগুলিকে ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং হিসেবে নথিভুক্ত না করে ‘কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা’, ‘বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন’ বা ‘জলে ডুবে মৃত্যু’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।

রিপোর্টে দেশের একাধিক রাজ্যের ভয়াবহ ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ৪ ফেব্রুয়ারি মুম্বইয়ের গোরেগাঁও এলাকায় ২৫ ফুট গভীর নর্দমা পরিষ্কার করতে নেমে বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়ে শামীম রাজাক গাজী (২৬) নামের এক চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মার্চ মাসে বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও উত্তরপ্রদেশে ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বিহারের বৈশালী ও সীতামড়হিতে সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে ৪ জন করে শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ইন্দোর, বালোত্রা, রায়পুর ও কানপুরেও একই ঘটনা ঘটে। ৭ জুন গুজরাতের সুরাটে এক জুয়েলারি কারখানার সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়। লুধিয়ানায় বিষাক্ত গ্যাসে মারা যান ৩ জন, যার মধ্যে বাবা ও ছেলেও ছিলেন। ফরিদাবাদে ৩ জন এবং বেঙ্গালুরুতে ৪ জন সাফাই কর্মী প্রাণ হারান।

গত ২৬ জুন দিল্লির মুন্ডকা শিল্পাঞ্চলের ‘মারওয়াহ প্রিন্টার্স’-এর সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে অরুণ, সন্দীপ এবং চন্দ নামের তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ড্যাসাম-এর একটি অনুসন্ধানকারী দল ২৭ জুন মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে জানতে পারে, কোনো রকম সুরক্ষা সরঞ্জাম, সেফটি হারনেস বা অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই তাঁদের ট্যাঙ্কে নামানো হয়েছিল। তদন্তে জানা যায়, প্রথমে সন্দীপ ট্যাঙ্কে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁকে বাঁচাতে অরুণ নামলে তিনিও জ্ঞান হারান। এরপর দুজনকে বাঁচাতে গিয়ে চন্দও বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়েন এবং তিনজনেরই মৃত্যু হয়। মৃতরা প্রত্যেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। ড্যাসাম জানিয়েছে, “এই কাজে বাধ্য হওয়া শ্রমিকদের সিংহভাগই দলিত, বিশেষ করে বাল্মীকি সম্প্রদায় এবং অত্যন্ত দরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিক। ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং আজ কেবল কোনো শ্রমের সমস্যা নয়; এটি আসলে হিন্দু সমাজব্যবস্থার জাতিগত স্তরবিন্যাস, অস্পৃশ্যতা, কাঠামোগত হিংসা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের এক নগ্ন রূপ।” এই ধরণের মৃত্যু সংবিধানের ১৪ (সাম্যের অধিকার), ১৭ (অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ), ২১ (জীবনধারণের অধিকার) এবং ২৩ (জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ) নম্বর অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন বলেও সরব হয়েছে সংগঠনটি।

ড্যাসাম দাবি তুলেছে—

১. প্রতিটি ঘটনায় ‘ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং অ্যাক্ট’ অনুযায়ী অবিলম্বে এফআইআর দায়ের করতে হবে।

২. সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মেনে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৩০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৩. পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যকে সরকারি চাকরি, ঘর এবং পেনশনসহ সম্পূর্ণ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. দোষী ঠিকাদার ও আধিকারিকদের গ্রেপ্তার করে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে।

৫. সেপটিক ট্যাঙ্ক ও নর্দমা পরিষ্কারের কাজ ১০০% যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে এবং দেশজুড়ে এর একটি বিশেষ অডিট করতে হবে।

সংগঠনটি সাফ জানিয়েছে, যতক্ষণ না এই অমানবিক প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি হচ্ছে, ততক্ষণ মৃতদের পরিবারের ন্যায়বিচারের জন্য তাদের এই লড়াই জারি থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!