নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: বাংলায় বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং ভুয়ো ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরির আন্তর্জাতিক চক্রের শিকড় খুঁজতে ডোমকলে হানা দিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। বৃহস্পতিবার সকালে মুর্শিদাবাদের ডোমকল থানার পার রঘুনাথপুরের টুলটুলি পাড়ায় একযোগে হানা দেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। সূত্রের খবর, আদিল উল রহমান নামের এক যুবকে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ, ওই যুবক বাংলাদেশের বাসিন্দা।
জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক মোটা টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য জাল ভারতীয় আধার কার্ড, ভোটার আইডি, প্যান কার্ড এবং অন্যান্য কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র তৈরি করে দিচ্ছিল। এই ভুয়ো কাগজপত্রের জোরেই দালাল চক্রের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। তদন্তে উঠে এসেছে, এই চক্রের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হতো পশ্চিমবঙ্গ থেকেই, যার সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার রাজ্যজুড়ে একাধিক জায়গায় হানা দেয় ইডির আধিকারিকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডোমকল থানার ধূলাউড়ি গ্রামপঞ্চায়েতের পার রঘুনাথপুরের বাসিন্দা মীর রাকিব আলির বাড়িতে এদিন হানা দেয় ইডির একটি দল। মীর রাকিব আলির জামাই আদিল উল রহমান আসলে একজন বাংলাদেশি নাগরিক। প্রায় বছর চারেক আগে সে প্রথম পার রঘুনাথপুরের এই বাড়িতে আসে। নিজেকে মাদ্রাসার ছাত্র এবং অনাথ পরিচয় দিয়ে পরিবারের লোকেদের সহানুভূতি ও বিশ্বাস অর্জন করে আদিল। সে বাড়ির সদস্যদের জানায়, মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার সময় সে দিল্লিতে চলে গিয়েছিল, যার কারণে তাঁর ভারতীয় ভোটার বা অন্য কোনো পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তাঁর মিষ্টি কথা ও আচরণে মীর রাকিব আলির পরিবার এতটাই প্রভাবিত হয় যে, পরবর্তীতে তাঁর সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেন রাকিব আলি। বিয়ের পর আদিল উত্তরপ্রদেশে পাড়ি দেয়, কিন্তু সেখানে সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের হাতে সে গ্রেফতার হয়েছিল।
উত্তরপ্রদেশে গ্রেফতার হওয়ার প্রায় তিন বছর পর সম্প্রতি ডোমকলে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসে আদিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, কলকাতায় জরুরি কাজ রয়েছে দাবি করে সে প্রায়দিনই কলকাতায় যাতায়াত করত। তবে দিন পাঁচেক আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে ডোমকল মহকুমা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ইডির গোয়েন্দারা সরাসরি ডোমকল হাসপাতালে পৌঁছান এবং চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে আদিলকে হাসপাতাল থেকে নিজেদের হেফাজতে তুলে নেন। এরপর তাঁকে সরাসরি পাররঘুনাথপুরের টুলটুলিপাড়ায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ঘরের দরজা বন্ধ করে আদিল ও তাঁর শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। এই চক্রের সাথে আর কোনো স্থানীয় প্রভাবশালী যুক্ত রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে ইডি।
ইডি সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলিকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করে এই চক্রটি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছিল বলেই সন্দেহ ইডি আধিকারিকদের। বৃহস্পতিবারের এই অভিযানে আদিলের শ্বশুরবাড়ি থেকে বেশ কিছু সন্দেহজনক ডায়েরি, ব্যাংকের নথি এবং ডিজিটাল ডিভাইস খতিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা। আদিলকে জেরা করে এই জাল নথি প্রস্তুতকারক সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা পশ্চিমবঙ্গের মূল মাথার খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে তদন্তকারীরা।
