নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: সম্প্রতি সামনে এসেছে ডোমকলের ১০টি ফেরিঘাটে দুর্নীতির কেচ্ছাকাহিনী। তৃণমূল নেতাদের মদতে প্রধানের সরকারি সিল ব্যবহার করে তৈরি জাল নথি দিয়ে দিনের পর দিন কীভাবে পারাপারের নামে তোলাবাজি চলেছে ওই ১০টি ঘাটে, ব্লক প্রশাসনের লিখিত অভিযোগের পরই তা সামনে এসেছে। কিন্তু শুধু ওই ১০টি ফেরীঘাটেই কি সীমাবদ্ধ ছিল এই কারবার? ডোমকলের মোট ১৯টি সরকারি ফেরিঘাটের মধ্যে বাকি ঘাটগুলিতেও তো দীর্ঘদিন ধরে পারাপারের নামে টাকা তোলা হয়েছে। তাহলে সেই লক্ষ লক্ষ টাকা কোথায় গেল? কারা সেই অর্থের সুবিধাভোগী? এবার সেই সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে তদন্ত করুক প্রশাসন চাইছেন ডোমকলবাসী।
প্রসঙ্গত, ডোমকল ব্লক জুড়ে রয়েছে মোট ১৯টি সরকারি ফেরিঘাট। সবক’টিই ডোমকল পঞ্চায়েত সমিতির অধীনস্থ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েক বছর আগেই ওই ঘাটগুলির পুরনো ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার পরেও বিভিন্ন ঘাটে পারাপারের নামে নিয়মিত টাকা তোলা চলত। অভিযোগ, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার মদতেই বছরের পর বছর এই অর্থ আদায় চলেছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রশাসন ফেরিঘাটগুলিতে পারাপারের নামে অর্থ আদায় বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে সাধারণ মানুষকে জানানো হয়, পারাপারের নামে কোনও অর্থ দেওয়া যাবে না। এরপর ফেরিঘাট সংক্রান্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়েই প্রশাসনের হাতে উঠে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রশাসনের দাবি, পঞ্চায়েত প্রধানের সিল ব্যবহার করে ঘোড়ামারা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বেবি নাজমিন খাতুন ও তাঁর স্বামী মিলে পঞ্চায়েত সমিতির অধীনস্থ ১৯টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১০টি ফেরিঘাটের জন্য ভুয়ো বন্দোবস্তের নথি তৈরি করা হয়েছিল। এরপরে সেই জাল নথিকেই হাতিয়ার করে বছরের পর বছর পারাপারের নামে অর্থ আদায় চলেছে। এর ফলে শুধুমাত্র ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষেই প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতির হয়েছিল। সপ্তাহখানেক আগেই ব্লক প্রশাসনের তরফে এমনই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল ডোমকল থানায়। আর তারপর থেকেই গোটা বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। তবে এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, যখন ওই ১০টি ফেরিঘাটে জাল নথির ভিত্তিতে পারাপারের নামে অর্থ তোলা হচ্ছিল, তখন বাকি ফেরিঘাটগুলিতেও তো একইভাবে টাকা আদায় চলছিল। সেগুলিরও কোনও বৈধ ইজারা ছিল না। তাহলে সেই ঘাটগুলিতে আদায় হওয়া অর্থ কোথায় গেল? সরকারি কোষাগারে জমা না পড়ে সেই টাকা কার হাতে পৌঁছেছিল? কারা সেই অর্থের সুবিধাভোগী? এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ডোমকলের বিভিন্ন মহলে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তদন্ত যদি শুধুমাত্র ওই ১০টি ঘাটেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পুরো চিত্র কখনো সামনে আসবে না। গত কয়েক বছরে ১৯টি ফেরিঘাটে কত টাকা আদায় হয়েছে, কারা সেই অর্থ তুলেছে এবং সেই অর্থ কোথায় গিয়েছে – তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এখন ১০টা ঘাটের হিসাব সামনে এসেছে। কিন্তু বাকি ঘাটগুলির কী হবে? সেখানেও তো বছরের পর বছর টাকা তোলা হয়েছে। সেই টাকার হিসাবও সামনে আনা উচিত। কারা এই তোলাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিল, তদন্ত করে সবটাই প্রকাশ করা দরকার। পাশপাশি প্রশাসনের কারও মদতে এই কারবার চলছিল কী না? -তাও তদন্ত করে দেখা দরকার। প্রশাসন সূত্রে দাবি, ওই ১০টি ঘাটে জাল নথি ব্যবহার করে যে কারবার চলেছিল সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই পুলিশে অভিযোগ করা হয়েছে। বাকিগুলি নিয়ে তেমন তথ্যপ্রমাণ এলে সেগুলিকে নিয়েও নির্দিষ্টভাবে যা ব্যবস্থা নেওয়া যায় নেওয়া হবে।
