TOP NEWS

স্বাধীনতা সংগ্রামী বরকতউল্লাহ নাম মুছে রাজা ভোজের নামে বিশ্ববিদ্যালয়, মধ্যপ্রদেশে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রদেশের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘বরকতউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়’ (Barkatullah University)-এর নাম পরিবর্তন করে “বাগদেবী ভোজপাল বিশ্ববিদ্যালয়” করার একটি প্রস্তাব সম্প্রতি অনুমোদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদ। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি রাজ্যের রাজ্যপাল তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মঙ্গুভাই প্যাটেলের কাছে পাঠানো হয়েছে। আর এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক।

১৯৭০ সালে ‘ভোপাল বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তীতে, ১৯৮৮ সালে ভারতের প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা বরকতউল্লাহ ভোপালীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এর নামকরণ করা হয় ‘বরকতউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়’। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পেশ করা প্রস্তাবে রাজা ভোজের ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মধ্য ভারতের সাহিত্য, বিজ্ঞান, স্থাপত্য এবং শিক্ষার প্রসারে একাদশ শতকের পারমার রাজবংশের শাসক রাজা ভোজের অবদান অবিস্মরণীয়। ভোপাল অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়— যেমন ভোজতাল (ভোপালের বড় হ্রদ) বা ভোজপুর মন্দির— রাজা ভোজের স্মৃতির সাথেই জড়িয়ে রয়েছে। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজা ভোজ প্রায় ৮০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে ২৭টি আজও পাওয়া যায়। তাঁর শাসনামলে বর্তমান ‘ধার’ (তৎকালীন ধারা নগরী) ছিল শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং সেখানকার ‘ভোজশালা’ ছিল দেবী সরস্বতীর মন্দির তথা একটি প্রাচীন জ্ঞানপীঠ। এই ভোজশালার দেবী সরস্বতীর নামানুসারেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নামকরণে “বাগদেবী” শব্দটি যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবটির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো, এতে রাজা ভোজের সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামী মাওলানা বরকতউল্লাহ ভোপালীর একটি সরাসরি তুলনা টানা হয়েছে। প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছে, রাজা ভোজের তুলনায় বরকতউল্লাহ ভোপালীর এই অঞ্চলের জন্য “কোনো উল্লেখযোগ্য অবদান দৃশ্যমান নয়, কেবল তিনি ভোপালের বাসিন্দা ছিলেন এটুকু ছাড়া।” এই যুক্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ভোপালের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে। এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, একজন ঐতিহাসিক চরিত্রের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে কি অন্য এক মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর অবদানকে খাটো করা হচ্ছে?

কে ছিলেন মাওলানা বরকতউল্লাহ ভোপালী?

ইতিহাসবিদ এবং সমালোচকদের মতে, মাওলানা বরকতউল্লাহ ভোপালী কেবল ভোপালের একজন সাধারণ বাসিন্দা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিসংবাদিত আন্তর্জাতিক মুখ। ১৮৫৪ সালের ৭ জুলাই ভোপালের ইতওয়ারা এলাকায় তাঁর জন্ম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচার চালানো বিপ্লবীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

তিনি বিখ্যাত ‘গদর আন্দোলন’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং গদর পার্টির মুখপত্রটি সম্পাদনা করতেন। ১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে ভারতের প্রথম যে ‘প্রবাসী অস্থায়ী সরকার’ (Provisional Government-in-Exile) গঠিত হয়েছিল, তিনি ছিলেন তার প্রধানমন্ত্রী। ওই সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী। তিনি একাধারে পণ্ডিত, সাংবাদিক এবং বহুভাষাবিদ ছিলেন। আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি লন্ডন, লিভারপুল এবং টোকিওতে শিক্ষকতা করেছেন। ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়তে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, তুরস্ক, আফগানিস্তান, সোভিয়েত রাশিয়া, ফ্রান্স ও রোম সফর করেছিলেন।

নাম পরিবর্তনের এই বিতর্কের সমান্তরালেই বরকতউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে বড়সড় প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী আরবি ও ফারসি ভাষা বিভাগকে পুনর্গঠিত করে একটি নতুন ‘তুলনামূলক ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ’-এর অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাবও মঞ্জুর করা হয়েছে। এখন রাজ্যপাল মঙ্গুভাই প্যাটেল এই বিতর্কিত নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবে সিলমোহর দেন কি না, সেটাই দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!