নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক হিংসা, রক্তপাত আর উত্তেজনার ইতিবৃত্ত মুছে দিয়ে এক নতুন ভোরের সাক্ষী থাকল ডোমকল। আজ বৃহস্পতিবার, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় মুর্শিদাবাদ জেলার এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর জনপদটি উপহার দিল এক সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। যে ডোমকলের নাম শুনলেই একসময় মানুষ আঁতকে উঠত, সেই জনপদেই আজ ফিরল গণতান্ত্রিক উৎসবের প্রকৃত মেজাজ। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত রানিনগরে ভোট পড়েছে ৯২.৪৫ শতাংশ, ডোমকলে ভোট পড়েছে ৯১.৬ শতাংশ এবং জলঙ্গিতে ভোটের হার ৯২.৩২ শতাংশ।
রণসজ্জার মাঝেও শান্তির মেজাজ
ভোটের আগের রাত থেকেই ডোমকলের আকাশে-বাতাসে ছিল কড়া নজরদারি। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ডোমকল বিধানসভা কেন্দ্রেই মোতায়েন ছিল ৪০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। কিন্তু এই কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যেও সাধারণ মানুষের মনে ভয়ের বদলে কাজ করেছে অদ্ভুত এক স্বস্তি। সকাল ৭টা বাজতেই ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে লম্বা লাইন চোখে পড়ে। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলা এবং প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। এক ভোটারের কথায়, ডোমকল বিধানসভা কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হল এবারের ভোটগ্রহণ। দীর্ঘদিন পর এমন নির্বিঘ্ন ও সংঘর্ষমুক্ত ভোট দেখে স্বস্তি লাগছে। নির্বাচন কমিশনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের সতর্কতায় ভোটের দিন জুড়ে কোথাও বড় ধরনের অশান্তির খবর মেলেনি।
স্বস্তির নিশ্বাস সাধারণ মানুষের
বিগত বছরগুলোতে ভোটের দিন ডোমকলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বোমাবাজি বা বুথ দখলের অভিযোগ আসত নিয়মিত। কিন্তু এবারের চিত্র ছিল একদমই উল্টো। রায়পুর থেকে কুচিয়ামোড়া— সব জায়গাতেই মানুষ অবাধে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা রফিকুল হকের কথায়, “আমার ষাট বছর বয়সে ডোমকলে এমন শান্তিপূর্ণ ভোট দেখিনি। আগে ভোটের দিন ঘরের বাইরে বেরোতেই ভয় লাগত, আর আজ নাতি-পুতিদের নিয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। গণতন্ত্র মানে তো এটাই।”
ডোমকলের বিভিন্ন বুথে ঘুরে দেখা যায়, ভোটারদের মধ্যে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ছবি। প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও ছিল আলাদা উচ্ছ্বাস। এক তরুণ ভোটার বলেন, “শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। কোনও ভয়ভীতি ছিল না।” একই কথা জানান এক প্রবীণ ভোটারও। তাঁর কথায়, “অনেক বছর পর এমন শান্তিতে ভোট দিলাম। আগে ভয় থাকত, কিন্তু এবার পরিবেশ অনেক ভালো।”
প্রশাসনের কৌশল ও সমন্বয়
শান্তিপূর্ণ ভোট করার পিছনে প্রশাসনের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও রণকৌশলকেই কৃতিত্ব দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জেলা পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ ‘কুইক রেসপন্স টিম’। ডোমকলের এসডিপিও বলছেন, প্রতিটি বুথে ওয়েবকাস্টিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি নজরদারি চালানো হয়েছে। কোনও গোলমালের সামান্য খবর আসা মাত্রই সেখানে বাহিনী পৌঁছে গিয়েছে। কোথাও কোথাও কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ ভোটারদের মনোবল বাড়িয়েছে।
রেকর্ড ভোটদান ও তৃণমূলের দাবি
দুপুর গড়াতেই মুর্শিদাবাদ জেলার ভোটদানের হার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বিকেল ৫টার মধ্যেই হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা নজিরবিহীন। পর্যবেক্ষকদের দাবি, এই বিপুল ভোটদান আসলে উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার পক্ষেই গিয়েছে। তৃণমূল নেতাদের মতে, মমতা-অভিষেক যেমন চেয়েছিলেন, এবারের ভোট ঠিক তেমনই নির্বিঘ্ন হয়েছে। যদিও বিকেলের দিকে ডোমকলের রায়পুর এলাকায় সামান্য রাজনৈতিক বচসা ও হাতাহাতির খবর মিলেছিল, কিন্তু বিশাল পুলিশ বাহিনী দ্রুত সেখানে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, “শান্তিপূর্ণ ভোট করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলেই আমরা মনে করছি।”
ডোমকলের এই শান্ত সমাহিত ভোট উৎসব আজ প্রমাণ করে দিল, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি আর জনগণের সদিচ্ছা থাকলে রাজনৈতিক হিংসার কঙ্কাল মুছে ফেলা সম্ভব।
