নিজস্ব সংবাদদাতা, জলঙ্গি: পেটের টানে ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে চরম হেনস্থার শিকার হলেন মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়ার পাঁচ পরিযায়ী শ্রমিক। মহারাষ্ট্রে মুম্বইয়ের কাফে প্যারেড থানা এলাকায় ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে তাঁদের তুলে নিয়ে গিয়ে দফায় দফায় বেধড়ক মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। মহারাষ্ট্র পুলিশ তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছে বলে অভিযোগ। এই মর্মান্তিক ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন শ্রমিকদের পরিবার। বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে তাঁরা এখন সাগরপাড়া থানার দ্বারস্থ হয়েছেন।
মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া থানার খয়রামারি এলাকার আরসালিম খান, ফারুক মোল্লা, মনিরুল ইসলাম, আসাদুল মোল্লা এবং সাহেবনগরের জাহাঙ্গীর শেখ—এই পাঁচ যুবক দীর্ঘদিন ধরে মহারাষ্ট্রে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতেই ভিটেমাটি ছেড়ে হাজার মাইল দূরে মুম্বই শহরে পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু শনিবারের একটি ঘটনা তাঁদের জীবন ও নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার ভাড়াবাড়িতে হানা দেয় স্থানীয় কাফে প্যারেড থানার পুলিশ। কোনও নথিপত্র যাচাই না করেই তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। শ্রমিকরা বারবার দাবি করেন তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এবং ভারতীয় নাগরিক। প্রমাণস্বরূপ তাঁরা তাঁদের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্র দেখান। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, পরিচয়পত্র দেখার পরও পুলিশ তাঁদের কথা কানে তোলেনি। উল্টে নথিপত্র জাল হওয়ার সন্দেহ প্রকাশ করে তাঁদের থানায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এক শ্রমিকের বাবা আনোয়ারুল হক ‘ডেইলি ডোমকল’-কে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ছেলের পাসপোর্ট দেখানোর পর ‘বাংলাদেশি’ বলে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার ছেলে সহ চারজনকে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে। দু’জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ফোন মারফৎ খবর পেয়েছি, তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।”
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথমবার থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই শনিবার সন্ধ্যায় ফের তাঁদের থানায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ, এবার জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলে অমানুষিক নির্যাতন। আরসালিম খানের স্ত্রী ইমতি খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, “শনিবার আচমকাই স্বামী ফোন করে বলে পুলিশ ওদের বাংলাদেশি সন্দেহে তাড়া করছে। ফোনে না পেলে আমাকে থানায় যোগাযোগ করতে বলেছিল। এরপর ওর ফোন বন্ধ পেয়ে আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি। এখন জানতে পারছি, ওকে বেধড়ক মারা হয়েছে। ওর বুকে ও গলায় লাথি মেরেছে পুলিশ। আমার মাত্র তিন মাসের সন্তান রয়েছে। স্বামী নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিল, সেখানে ওর সঙ্গে এমন হবে স্বপ্নেও ভাবিনি।” আরেক আক্রান্ত পরিযায়ী শ্রমিক ফারুক মোল্লার বাবা মফিদুল ইসলাম বলেন, “আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ব্যাপকভাবে মারধর করেছে। আমরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি।”

অন্যদিকে সাহেবনগরের জাহাঙ্গীর শেখ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে মুম্বাইয়ে কাজ করেন। কোনওদিন সমস্যায় পড়তে হয়নি। বাংলায় কথা বলায় শনিবার জাহাঙ্গীর ও তার স্ত্রী পান্না বিবিকে ‘বাংলাদেশি’ বলে তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় পুলিশ। শ্রমিকের বাবা সিরাজুল শেখ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমার ছেলের কাছে পাসপোর্ট পর্যন্ত রয়েছে। একজন পাসপোর্টধারী ভারতীয় নাগরিককে কোন সাহসে বাংলাদেশি সাজিয়ে মারধর করা হলো? আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব।”
সাগরপাড়ার বাসিন্দাদের দাবি, যে পুলিশ আধিকারিকরা আইন ভেঙে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন, তাঁদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি, মহারাষ্ট্রে কর্মরত অন্যান্য বাঙালি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকারকে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা। স্থানীয় সাহেবনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মজিবর রহমান বিশ্বাস ‘ডেইলি ডোমকল’-কে বলেন, কেন্দ্রে বিজেপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলার শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন, হেনস্থা ও হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক ভাবে বেড়েছে। হিন্দু-মুসলিম নয় তাদের টার্গেটই বাঙালিরা। দেশে জেনো বাংলা ভাষায় কথা বলা অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাই কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিন রাজ্যের বহু শ্রমিক বাংলায় কাজ করেন, তাদের কখনো হেনস্থা বা মারধর করা হয় না। তাহলে কেনো বাংলার শ্রমিকদের হেনস্থা করা হচ্ছে। প্রধান আরও জানিয়েছেন, “আমরা শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং পুলিশকে সমস্ত নথিপত্র দিয়েছি।”

ঘটনাটি জানাজানি হতেই সাগরপাড়া এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়। পরিজনরা তড়িঘড়ি সাগরপাড়া থানার পুলিশের সাহায্য চান। এরপরই নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। সাগরপাড়া থানা থেকে মহারাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়। শ্রমিকদের নথিপত্র যে বৈধ এবং তাঁরা যে এদেশেরই নাগরিক, তা নিশ্চিত করে মুর্শিদাবাদ পুলিশের পক্ষ থেকে রিপোর্ট পাঠানো হয়। ডোমকলের এসডিপিও (SDPO) শুভম বাজাজ জানিয়েছেন, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই মহারাষ্ট্রের পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁদের প্রয়োজনীয় সমস্ত রিপোর্ট পাঠানো হয়। আমাদের তৎপরতার পরেই ওই পাঁচ শ্রমিককে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে।”
এই ঘটনা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজের সন্ধানে যাওয়া শ্রমিকদের মাঝেমধ্যেই ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্তার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বৈধ পরিচয়পত্র ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ও পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। এক মানবাধিকার কর্মীর বক্তব্য, পুলিশি নির্যাতনের শিকার হওয়া ওই পাঁচ যুবক বর্তমানে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাঁদের শারীরিক ক্ষত হয়তো সেরে যাবে, কিন্তু খোদ প্রশাসনের হাতে হেনস্তা হওয়ার স্মৃতি তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াবে। এই ঘটনার পর শ্রমিকরা সেখানে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সাথে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা বড় প্রশ্নের।
