নিজস্ব সংবাদদাতা, জলঙ্গি: আজ সোমবার। রাজ্যজুড়ে হাজার হাজার পড়ুয়া যখন বুকভরা আশা নিয়ে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা—মাধ্যমিকে বসছে, তখন মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়ার খয়রামারি পাঁজরাপাড়ার একটি ঘরে শুধুই স্তব্ধতা। পড়ার ঘরের কোণে অযত্নে পড়ে আছে বইপত্র, কলম আর মাধ্যমিকের সেই বহু প্রতীক্ষিত অ্যাডমিট কার্ডটি। নেই শুধু পরীক্ষার্থী। গত ২০ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার পর গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল দশম শ্রেণির ছাত্র সাহিন মন্ডলের (১৬) দেহ। আজ তার পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল ভাদুরিয়াপাড়ার কাজী নজরুল হাইস্কুলে, কিন্তু সাহিন এখন পরলোকে।
Read More: সাগরপাড়ায় মাঠের মধ্যে কিশোরের নলি কাটা দেহ উদ্ধার
পরিবারের চোখে-মুখে আজ একরাশ শূন্যতা। সাহিনের মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, “ছেলে মাছ-মাংসের চেয়ে সবজি খেতে বেশি ভালোবাসত। আজ ও বেঁচে থাকলে ওর জন্য পাঁচ রকমের সবজি রান্না করতাম। গরম গরম ভাত খেয়ে ও হাসিমুখে পরীক্ষা দিতে যেত। কিন্তু উপরওয়ালা আমার কোল খালি করে দিয়েছে।” ছেলের স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেন বাবাও। কিন্তু আজ সব স্মৃতি। সাহিনের বাবা রমজান আলি মন্ডল আর্তনাদ করে বলছেন, “আমার আর কিছু নেই, সব শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু ন্যায়বিচারের আশায় দিন গুনছি।” সাহিনকে ঘিরে পরিবারের যে স্বপ্ন ছিল, তা আজ পেঁয়াজ খেতের সেই রক্তেভেজা মাটিতেই মিশে গেছে।
উল্লেখ্য, গত ২০ জানুয়ারি সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি সাহিন। সারারাত খোঁজাখুঁজির পর পরদিন দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা খয়রামারি এলাকার একটি পেঁয়াজ খেতের মধ্যে সাহিনের নিথর, গলাকাটা দেহটি পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে সাগরপাড়া থানার পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠায়। সেই থেকে গত ১৩ দিন ধরে শোকাতুর পরিবারটি বিচারের আশায় পথ চেয়ে বসে আছে।
সাহিন খুনের ঘটনার দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এমনকি খুনের কোনো কিনারাও করতে পারেনি প্রশাসন। পুলিশের তদন্ত নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে নিহতের পরিবার। নিহতের মায়ের প্রশ্ন: “ছেলেকে তো হারিয়েছি, কিন্তু খুনিরা কেন এখনও অধরা? এতদিন ধরে পুলিশ কী করছে? কেন তাদের ধরা যাচ্ছে না? আমি শুধু আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি চাই।”
Read More: সাগরপাড়ায় মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী খুনে ৮ দিন পার: এখনও অধরা খুনি
সাগরপাড়া থানার পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হলেও কোনো সন্দেহভাজন এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি। সাধারণ মানুষ ও পরিবারের দাবি, দ্রুত এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের কিনারা করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা হোক। এদিকে সাহিন আজ পরীক্ষা দিতে পারল না, কিন্তু তার পরিবার এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে—যে পরীক্ষার নাম ‘ন্যায়বিচার’।
