সাম্প্রদায়িক আস্ফালন ও সাংবিধানিক মর্যাদার সংকট
(Image: AI Generated)
——————————————————————————-
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় একজন মুখ্যমন্ত্রীর পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং তা রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার অতন্দ্র প্রহরীর মতো। কিন্তু আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য সেই আস্থার ভিতকে শুধু নাড়িয়েই দিচ্ছে না, বরং তা দেশের বিচারবিভাগ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি এক চরম অবজ্ঞার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি গোয়ালপাড়ায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনক। মুসলিম রিকশাচালকদের ভাড়ার টাকা কম দেওয়ার উস্কানি দেওয়ার পর তিনি সাফাই গেয়েছেন যে, “দেশের আইন বলছে এদেশে মুসলিমদের রিকশা চালানোর কথা নয়।” প্রশ্ন ওঠে, ভারতীয় সংবিধান বা দেশের কোন আইন একজন নাগরিককে তাঁর ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাহ থেকে বিরত রাখার কথা বলে? কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ধারার উল্লেখ ছাড়াই দেশের আইনকে এভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা সরাসরি বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার শামিল।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের ন্যায্যতা প্রমাণে সুপ্রিম কোর্টের দোহাই দিয়ে যে ‘জনবিন্যাসগত আগ্রাসন’ বা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশে’র তত্ত্ব খাড়া করছেন, তার সপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট রায়ের উল্লেখ নেই। দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠীর মনে ভীতি সঞ্চার করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘৃণার বীজ বপন করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যখন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন যে, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হয়ে যেতে পারে, তখন তিনি আসলে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে ‘দেশের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা ‘৭ নম্বর ফরম’ অপব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। যদি রাতের অন্ধকারে সরকারি দপ্তরে বসে ভোটার তালিকা কারচুপির ঘটনা ঘটে থাকে এবং তার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন নীরব থাকে, তবে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাটুকু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? একজন সমাজকর্মীর করা মামলার বিপরীতে “একশোটি পালটা মামলা” করার যে হুমকির সুর মুখ্যমন্ত্রীর গলায় শোনা গেছে, তা ক্ষমতার দম্ভেরই বহিঃপ্রকাশ।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ঘৃণার রাজনীতি বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। আসামের রাজনৈতিক আবহে এখন যে অস্থিরতা এবং বিদ্বেষের বাতাবরণ তৈরি করা হচ্ছে, তার লাগাম টানা প্রয়োজন। আদালত এবং নির্বাচন কমিশনের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই ধরণের বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে আইনের শাসনের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।
