TOP NEWS

শূন্যের গেরো কাটল: বাম শিবিরে একমাত্র প্রদীপ জ্বালালেন ডোমকলের রানা

নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। অবশেষে বাংলার বিধানসভায় নিজেদের খাতা খুলল সিপিআইএম। এক আসনে জয়ের মধ্য দিয়ে শূন্যের গেরো কাটল বাম শিবির। আর এই জয় এল মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্র থেকে। সিপিআইএম প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান (রানা) তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী, প্রাক্তন আইপিএস ও ডেবরার বিদায়ী বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে ১৬ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে নজর কাড়লেন।

এক সময় ডোমকল ছিল বামেদের শক্ত ঘাঁটি। সেই সময়ের অবিসংবাদী নেতা ছিলেন আনিসুর রহমান, যিনি ২০১৬ সালের ‘সবুজ ঝড়’-এর মধ্যেও নিজের আসন ধরে রেখেছিলেন। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এরপরই এই কেন্দ্রে নতুন মুখ হিসেবে উঠে আসেন মোস্তাফিজুর রহমান। ২০২১ সালের নির্বাচনে তিনি লড়লেও তৃণমূল প্রার্থী জাফিকুল ইসলামের কাছে প্রায় ৪৭ হাজার ভোটে হেরে যান। তবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতি বদলে দিয়ে ডোমকলের মাটি পুনরুদ্ধার করলেন তিনি।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ডোমকল কেন্দ্রে তৃণমূল মোট ভোট পেয়েছে ৯১,৩৪৩টি, কংগ্রেস পেয়েছে ৩০,৩৮১টি ভোট, বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে মোট ১৩,০৬৪টি ভোট এবং সিপিআইএম-এর মোট প্রাপ্ত ভোট ১,০৭,৫৭৫টি। অথার্ৎ ডোমকল কেন্দ্রে ১৬,২৩২টি ভোটে জয়ী হয়েছেন সিপিআইএম প্রার্থী।

রাজ্য রাজনীতিতে এখনও তুলনামূলকভাবে ‘অখ্যাত’ হলেও সংগঠনের ভিতরে পরিচিত মুখ মোস্তাফিজুর। তিনি সিপিআইএম-এর ডোমকল উত্তর জোনাল কমিটির সম্পাদক এবং ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এক তরুণ নেতা। শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। জয়ী হওয়ার পর তিনি বলেন, “আগামী দিনে মানুষের কাজ করাই আমার মূল লক্ষ্য।”

তবে এই জয়ের নেপথ্যে একাধিক রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং প্রার্থী নির্বাচনে অসন্তোষ বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। স্থানীয় নেতৃত্বের পরিবর্তে বহিরাগত প্রার্থী হিসেবে হুমায়ুন কবীরকে ডোমকলে পাঠানো নিয়ে দলের একাংশ ক্ষুব্ধ ছিল। একইভাবে কংগ্রেসের প্রার্থী শাহনাজ বেগমকেও ‘বহিরাগত’ বলে বিরোধিতা করেছিলেন দলেরই কিছু নেতা-কর্মী।

রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূল ও কংগ্রেস—উভয় দলের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর ভোটের বড় অংশই মোস্তাফিজুরের ঝুলিতে গিয়েছে। পাশাপাশি, সিপিআইএম-কংগ্রেস জোটের পূর্ববর্তী নির্বাচনী লড়াইয়ের ফলে কংগ্রেস সমর্থকদের একাংশের মধ্যে সিপিআইএমের প্রতি ভোটদানের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, যা এই নির্বাচনে বজায় থেকেছে।

স্থানীয় স্তরেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছিল আগেই। ডোমকল পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৫০০ পরিবার একযোগে তৃণমূল ছেড়ে সিপিআইএমে যোগ দেন। দুর্নীতি, দলীয় কোন্দল এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই তাঁদের এই সিদ্ধান্ত বলে জানা যায়। সেই সময় থেকেই এলাকায় রাজনৈতিক হাওয়া বদলের আভাস মিলছিল।

এছাড়া, ডোমকল পুরসভা ও পঞ্চায়েত স্তরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগও ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন অনেকেই। সাধারণ মানুষের একাংশের ক্ষোভ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। সব মিলিয়ে, ‘ঘরের ছেলে’ মোস্তাফিজুর রহমানের এই জয় শুধু একটি আসন পুনরুদ্ধার নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বামেদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!