TOP NEWS

আপনি কি নতুন চাকরির ইন্টারভিউ দেবেন? এবার মুখোমুখি হতে পারেন এআই-এর!

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: আপনি কি সম্প্রতি কোনও নতুন চাকরির জন্য আবেদন করেছেন? যদি আপনার আবেদনপত্রটি বাছাই বা শর্টলিস্ট করা হয়ে থাকে, তবে এবার মানুষের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। বিভিন্ন ইজি-অ্যাপ্লাই জব পোর্টাল থেকে ধেয়ে আসা এআই-জেনারেটেড হাজার হাজার জীবনবৃত্তান্ত বা সিভির বন্যায় জেরবার হয়ে নিয়োগকারী বা রিক্রুটাররা এখন এআই প্রযুক্তিরই দ্বারস্থ হচ্ছেন। প্রাথমিক বাছাই বা স্ক্রিনিং পর্বে প্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিতে কোম্পানিগুলি এখন চ্যাটবট, ফোন কল, টেক্সট মেসেজিং কিংবা অন-স্করিন এআই নারী-পুরুষের অবতার (Avatar) ব্যবহার করছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এআই-চালিত টুলের ব্যবহার নতুন কিছু নয়, তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে এর পরিধি এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিয়োগকারী প্ল্যাটফর্ম ‘গ্লাসহাউস’ (Glasshouse)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, আগের চেয়ে অনেক বেশি চাকরিপ্রার্থী এখন এআই ইন্টারভিউর মুখোমুখি হওয়ার কথা জানাচ্ছেন। তবে এই যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক আবেদনকারী মাঝপথেই ইন্টারভিউ ছেড়ে চলেও যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকে এতে অস্বস্তি বোধ করছেন, আবার অনেকের ক্ষেত্রে তারা হয়তো জালিয়াতি বা কম আগ্রহ নিয়ে আবেদন করেছিলেন।

এআই ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতা

নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক নিয়োগ প্রযুক্তি সংস্থা ‘টেস্টগরিলা’ (TestGorilla)-র তৈরি একটি ডেমো বা পরীক্ষামূলক এআই ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এক চাকরিপ্রার্থী। সেখানে প্রথমে সমস্যা সমাধান এবং কাজের অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের দুটি প্রশ্ন সেট দেওয়া হয়। এরপর অন-স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এআই-জেনারেটেড এক নারীর মুখ। সরাসরি যান্ত্রিক কণ্ঠে সেটি বলে ওঠে, “আমার লক্ষ্য আপনার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা সম্পর্কে জানা। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আপনি ২ মিনিট করে সময় পাবেন।” মানুষের নেওয়া ইন্টারভিউয়ের মতো এখানে কোনও প্রাথমিক সৌজন্য বিনিময়, হাসিমুখে পরিবেশ হালকা করা বা ‘আইস-ব্রেকিং’-এর কোনও সুযোগ ছিল না। ফলে হাসা বা সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করা এখানে সম্পূর্ণ নিরর্থক।

এআই ইন্টারভিউতে সফল হওয়ার ৪টি মূল চাবিকাঠি

চাকরি বিষয়ক অনলাইন পোর্টাল ‘ইনডিড’ (Indeed)-এর ট্রেন্ডস এডিটর প্রিয়া রাঠোড় এবং ‘কেরিয়ারমাইন্ডস’ (Careerminds)-এর কেরিয়ার কোচ আমান্ডা অগাস্টিনের মতে, একটু প্রস্তুতি নিলেই এই যান্ত্রিক ভয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

এর জন্য ৪টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করতে হবে—

১. স্পষ্ট উচ্চারণ ও জোরে কথা বলার অভ্যাস: যেহেতু আপনার উত্তরটি একটি চ্যাটবট রেকর্ড করবে, তাই মনে মনে না পড়ে স্পষ্ট ভাষায় জোরে জোরে উত্তর দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। মানুষের মতো এআই আপনার গলার টোন বা মুখের অভিব্যক্তি দেখে সবটা বুঝবে না, তাই নিজের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং বিশদভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে।

২. ‘স্টার’ (STAR) পদ্ধতির ব্যবহার এবং সংখ্যার খেলা: এআই সাধারণত ‘বিহেভিওরাল’ বা আচরণগত প্রশ্ন বেশি করে। ডেমো ইন্টারভিউতে যখন একজন প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তিনি তাঁর কাজে কীভাবে এআই ব্যবহার করেন, তখন তিনি উত্তর দেন যে ‘এআই ট্রান্সক্রিপশন টুল’ ব্যবহার করে তাঁর অনেক সময় বাঁচে। কিন্তু টেস্টগরিলা তাঁর এই উত্তরকে ‘গড়ের চেয়ে কম’ (Below Average) রেটিং দেয়। কারণ, তিনি নির্দিষ্ট করে কত মিনিট বা কত শতাংশ সময় বাঁচিয়েছেন, তার কোনও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা ‘কংক্রিট মেট্রিক’ দেননি। ফলে উত্তরটি এআই-এর কাছে অস্পষ্ট মনে হয়েছে। তাই উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রখ্যাত STAR পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে:
S – Situation: কর্মক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি।
T – Task: আপনাকে কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
A – Action: আপনি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
R – Result: তার ফলাফল কী হয়েছিল (অবশ্যই সংখ্যা বা ডেটা সহ)।

STAR উত্তর পরিকাঠামো: পরিস্থিতি ──> নির্দিষ্ট দায়িত্ব ──> আপনার পদক্ষেপ ──> সংখ্যাভিত্তিক ফলাফল (যেমন: ২০% সময় সাশ্রয়)

৩. অনলাইন সিমুলেটর দিয়ে অনুশীলন: ইন্টারভিউয়ের ভয় কাটাতে অনলাইনের বিভিন্ন ইন্টারভিউ সিমুলেটর ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলি আপনার উত্তর রেকর্ড করে কন্টেন্ট, বলার গতি এবং ডেলিভারির ওপর তাৎক্ষণিক ফিডব্যাক দেয়। এর ফলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলা এবং সময় নিয়ন্ত্রণ করার জড়তা কেটে যায়।

৪. ল্যাপটপের অবস্থান ও লাইটিং ঠিক রাখা: ইন্টারভিউ মানুষ না নিয়ে এআই নিলেও আপনার পেশাদারিত্বের প্রকাশ সমান জরুরি। ইন্টারভিউয়ের আগে অডিও এবং ভিডিও টেস্ট করে নেওয়া উচিত। আলো যেন সরাসরি আপনার মুখের ওপর পড়ে। ল্যাপটপটি চোখের সোজাসুজি (Eye level) রাখতে বইয়ের স্তূপ ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে ক্যামেরার দিকে নীচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে না হয়।

প্রতারণা রুখতে এআই-এর পাতা ‘ফাঁদ’!

অনেক চাকরিপ্রার্থী ভাবেন, ওপাশে তো কোনও মানুষ নেই, তাই উত্তর দেওয়ার জন্য আড়ালে অন্য কোনও এআই বা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করলে কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন— এই ভুল করলেই সরাসরি বাতিল বা ডিসকোয়ালিফাই হতে হবে। কারণ এআই ইন্টারভিউয়াররা সহজেই তা ধরে ফেলে। টেস্টগরিলা-র মার্কেটিং প্রধান মেহাক চৌধুরী একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, প্রার্থীরা আড়ালে কোনও এআই ডিভাইস ব্যবহার করে জালিয়াতি করছে কি না, তা ধরার জন্য তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু সহজ প্রশ্ন অত্যন্ত জটিল বা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেন। যদি কোনও প্রার্থী আড়ালে এআই চালান, তবে সেই এআই স্ক্রিপ্টটি প্রশ্নের দৈর্ঘ্য ও জটিলতা অনুযায়ী উত্তর অপ্টিমাইজ বা তৈরি করতে গিয়ে সময় নেবে এবং ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু যার নিজের দক্ষতার ওপর ভরসা আছে, সে সহজেই বুঝবে আসলে কী জানতে চাওয়া হয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট পরামর্শ— এআই ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় অন্যান্য সমস্ত এআই ডিভাইস দূরে সরিয়ে রাখুন। কারণ এটি আপনার কৃত্রিম চাতুরির নয়, বরং আপনার নিজস্ব যোগ্যতার পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!